Infinix Hot 60 Pro রিভিউ: স্লিম ফোনের রাজপুত্র নাকি শুধুই চকচকে মোড়ক?
বাংলাদেশের স্মার্টফোন মার্কেটে এখন সবাই চায় একটাই জিনিস—ভ্যালু ফর মানি। আর সেই জায়গায় Infinix তাদের Hot সিরিজ নিয়ে সবসময়ই তুমুল প্রতিযোগিতা করে আসছে। এবার তারা নিয়ে এলো Infinix Hot 60 Pro। দাম শুনলে প্রথমে চোখ কপালে উঠবে: মাত্র ২০,৯৯৯ টাকা। কিন্তু এই বাজেটে তারা প্রমিজ করছে স্লিম ডিজাইন, 144Hz ডিসপ্লে, আর 5160mAh ব্যাটারি। শুনতে তো রূপকথার মতো লাগে, তাই না? কিন্তু বাস্তবে কেমন? ফোনটা কি আসলেই ইউজ় করার মতো, নাকি শুধুই কাগজে-কলমে বড় বড় সংখ্যা? চলো, একদম গভীরে গিয়ে জেনে আসি।
Design & Build Quality
প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে লাগে, সেটা হলো এই ফোনের স্লিমনেস। বাজারে এখন স্লিম ফোন আনতে গেলে কোম্পানিগুলো লাখ টাকা খরচা করে ফেলে। আর এখানে Infinix সেই স্লিম ডিজাইন নিয়ে এসেছে মিড-রেঞ্জ বাজেটে। হাতে নেওয়ার পর প্রথম যে অনুভূতি হয়, সেটা হলো আরাম। ফোনটা হাতে নিলে মনে হয় না যে একটা ৬.৭ ইঞ্চির পাহাড় হাতে নিয়ে বসে আছি। ফোনটার চারপাশে গোল করে ঘষা edge থাকায় গ্রিপটা দারুণ হয়েছে। দেখতে যেমন সুন্দর, ধরতেও আরামদায়ক।
এত বড় ডিসপ্লে আর ৫০০০+ mAh ব্যাটারির ফোন এতটা হালকা আর চিকন হবে, এটা ভাবাই কঠিন। সাধারণত স্লিম ফোন মানেই ব্যাটারি কম—এই থিওরিতে আমরা সবাই বিশ্বাসী। কিন্তু এখানে Infinix সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। ফোনটা যথেষ্ট স্লিম হওয়ার পরও ভেতরে পুরনো দিনের মতোই তাগড়া ব্যাটারি রেখেছে। তবে ডিজাইনের দিক থেকে একটা জিনিস খটকা লাগতে পারে—ফোনের পেছনের দিকটা একটু বেশি প্লাস্টিকি প্লাস্টিকি ভাব আছে। গ্লাস ফিনিশিং দেওয়া থাকলেও ওই প্রিমিয়াম ফিলটা পুরোপুরি আসে না। তবে ২০,৯৯৯ টাকার ফোনের কাছে নকিয়া ৩৩১০-এর মতো টেকসই চামড়ার বডি আশা করাটা বোকামি হবে। এভারেজ ইউজ়ারদের জন্য এই বিল্ড যথেষ্ট শক্তপোক্ত।
Display Experience
এই ফোনের ডিসপ্লেটা নিয়ে এককথায় বলতে গেলে—এটা সেগমেন্টের সেরা। Infinix এখানে কোনো আপস করেনি। ডিসপ্লের ব্রাইটনেস এতটাই বেশি যে, চোখ ধাঁধিয়ে যায়। রোদের নিচেও স্ক্রিন পরিষ্কার বোঝা যায়। একটা মজার ব্যাপার বলি, এটার পিক ব্রাইটনেস আমার ব্যক্তিগত Samsung S25 Ultra থেকেও বেশি মনে হয়েছে (যদিও ডিসপ্লের সার্বিক মান Ultra-র চেয়ে ভালো না, কিন্তু ব্রাইটনেসের জায়গাটায় চমকে দিয়েছে)।
এবার আসি 144Hz রিফ্রেশ রেটের গল্পে। এটা নিয়ে মার্কেটিং জোরদার চলছে। ব্যাপারটা হলো, ফোনের প্রসেসর আসলে পুরোদমে 144Hz সাপোর্ট করে না। কিছু নির্দিষ্ট অ্যাপে এটা কাজ করলেও বেশিরভাগ সময় ফোনটা 120Hz-এই চলে। কিন্তু সত্যি বলতে, 120Hz আর 144Hz-এর মধ্যে পার্থক্য চোখে বোঝা সত্যিই কঠিন। 120Hz-এই যথেষ্ট স্মুথনেস পাওয়া যায়। UI ট্রানজিশন থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং—সব লিকুইডের মতো ফিল হবে। ২০,০০০ টাকার ঘরে এই ডিসপ্লে এক্সপেরিয়েন্স বিরল।
Performance & Gaming
পারফরম্যান্সের জায়গায় Infinix Hot 60 Pro তে আছে MediaTek Helio G200 প্রসেসর। এই চিপটা এই বাজেটে বেশ ক্যাপাবল। দৈনন্দিন কাজে ফোনটা হোঁচট খায় না। Facebook, Instagram, Messenger, YouTube—এসব চলতে থাকে অনায়াসে। অ্যাপ ওপেন ক্লোজ় করা, মাল্টিটাস্কিং—সব লেভেলে ঠিকঠাক কাজ করে।
কিন্তু গেমিং? এখানে একটু ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করতে হবে। PUBG বা Free Fire-এর মতো গেম খেলতে চাইলে PUBG-এর জন্য এটা একদমই না। Free Fire খেলতে পারবেন আরামে, তবে হাই-এন্ড কম্পিটিটিভ লেভেলে নয়। নিয়মিত গেমারদের জন্য ঠিক আছে। আরেকটা মজার টেস্ট করা হয়েছিল: ৮০% স্টোরেজ ফুল করে ফোনের গলদঘাম বের করার চেষ্টা করেও ফোনটা খুব একটা পেরেশানি দেয়নি। হেভি টাস্কে ফোন প্যারালাইজ়ড হয়ে যায়নি। পাওয়ার ইউজ়ার না হলে, এই প্রসেসর আপনার জন্য যথেষ্ট।
সফটওয়্যার নিয়ে আগে Infinix-এর নাম শুনলেই নাক সিঁটকালেও এখন অবস্থা বদলেছে। আগের মতো ব্লোটওয়্যার আর অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের বন্যা নেই। কিছু প্রি-ইনস্টলড অ্যাপ থাকলেও সেগুলো এখন ইউজ়ার চাইলেই আনইনস্টল করতে পারে, যেটার জন্য Infinix-কে থ্যাংকস দিতেই হয়। সফটওয়্যারটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পলিশড এবং ক্লিন।
Camera System
ক্যামেরা নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে বসলে কপালে দুঃখ আছে। এই বাজেটে এসে ক্যামেরা সবসময়ই একটা আপসের জায়গা। Infinix Hot 60 Pro-এর ক্যামেরা সিস্টেমকে আমি বলব "ঠিকঠাক"। দিনের আলোতে ছবি ভালোই আসে, সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্য পারফেক্ট। সেলফি ক্যামেরাটা আসলেই ভালো। দিনের আলোতে ভাই খুবই জোশ—মানে দারুণ সেলফি তোলা যায়। মেয়েদের কাছে ফোনটা পপুলার করার জন্য Infinix বোধহয় সেলফি ক্যামেরাটা বুস্ট করে রেখেছে। নাইট মোডে সেলফিও খারাপ না।
কিন্তু মেইন সেন্সর নিয়ে একটু কথা আছে। আলো একটু কম পড়লে বা লাইটিং ব্যালেন্স ঠিকঠাক না থাকলে প্রচুর নয়েজ ক্যাপচার করে। দিনের বেলা ইটস ফাইন, রাতের বেলা ইটস নট দ্যাট গুড। রাতের ছবিতে নয়েজের বন্যা বয়ে যায়। ভিডিওর ক্ষেত্রে 2K 30fps পর্যন্ত সাপোর্ট করলেও আমি রিকমেন্ড করব 1080p 60fps-এ শুট করতে। এতে করে ভিডিওতে একটা ব্যালেন্স পাবেন এবং স্টেবিলাইজেশনও তুলনামূলক ভালো আসবে। সেলফি ভিডিওতেও একই কথা প্রযোজ্য। 2K-তে সেলফি ভিডিও তুলতে পারলেও 1080p 60fps-এই বেটার রেজাল্ট দেয়।
Battery Life & Charging
স্লিম ফোনের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাটারি। কিন্তু Infinix সেই চ্যালেঞ্জ জিতে গেছে। 5160mAh-র বিশাল ব্যাটারি দিয়েছে, যা একদিনের বেশি আরামে চলে। হটস্পট চালিয়ে সারাদিন ব্যবহার করেও ৫০%-এর বেশি চার্জ বেঁচে আছে। এক ঘণ্টা Free Fire খেলার পর ব্যাটারি ড্রপ করেছে মাত্র ১৮%, যা দুর্দান্ত।
তবে, ব্যাটারি ক্যাপাসিটি যত বড়, ব্যাকআপ তত বেশি হবে—এই সমীকরণ পুরোপুরি মেলেনি। সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন এখনো পুরোপুরি হয়নি বলেই এমনটা মনে হয়েছে। তবে এটা প্রথম রিলিজ, আপডেটের পর আশা করা যায় আরও ভালো রেজাল্ট দেবে। বক্সে পেয়ে যাবেন 45W ফাস্ট চার্জার, যেটা এই প্রাইসে বেশ বড় প্লাস পয়েন্ট। বড় ব্যাটারি তাড়াতাড়ি চার্জ করতে পারা মানেই বড় সুবিধা।
Software & Features
Infinix-এর সফটওয়্যার নিয়ে মানুষের অভিযোগ ছিল। কিন্তু এখন সেই জায়গাটায় বেশ উন্নতি হয়েছে। ফোনটা Android 14 বেসড XOS-এ চলে। আগের XOS-এর জঘন্য ব্লোটওয়্যার আর বিজ্ঞাপনের কথা মনে আছে? এই ফোনে সেগুলো নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে, তা আনইনস্টল করা যায়।
এই ফোনের একটা দারুণ ফিচার হলো Circle to Search। এই ফিচার iPhone 16 Pro Max-এ পাবেন না, কিন্তু এই ফোনে পেয়ে যাচ্ছেন। সাথে আছে একটা ডেডিকেটেড AI বাটন। এআই ফিচারগুলো এখনো পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী না হলেও, ফিউচার আপডেটে আরও ভালো হবে আশা করা যায়। এই বাজেটে এসব ফিচার পাওয়াটা বাড়তি পাওনা।
Final Verdict
Infinix Hot 60 Pro ২০,৯৯৯ টাকা দামে অনেক কিছু প্রমিজ করে, আর বেশিরভাগই রাখে। ডিসপ্লে অসাধারণ, ব্যাটারি লাইফ দারুণ, আর চার্জিং স্পিড ফাটাফাটি। ডিজাইন স্লিম আর হাতে নিলে প্রিমিয়াম লাগে। পারফরম্যান্স ডে-টু-ডে ইউজের জন্য দারুণ, গেমিংয়ের জন্য মোটামুটি। ক্যামেরা দিনের আলোয় ভালো, কিন্তু রাতের বেলা নয়।
সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা আমাকে ভাবিয়েছে, সেটা হলো এই ফোনের অফিশিয়াল দাম। বাংলাদেশ সরকারের করা প্রায় ৬০% ভ্যাট ট্যাক্সের কারণে অফিশিয়াল ফোনের দাম অনেক বেড়ে যায়। যার জন্য আমরা অফিশিয়ালি যে ফোন কিনি, তার দামের সাথে ইউরোপ-আমেরিকার দামের আকাশ-পাতাল তফাৎ। ইনফিনিক্স হট ৬০ প্রো-এর দাম ২০,৯৯৯ টাকা হওয়া সত্ত্বেও, এটা তার দামের তুলনায় ঠিকঠাক ফোন। কিন্তু এই দামের পেছনে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি ভ্যাট কমে আসে, তাহলে আমরা আরও ভালো ফোন আরও কমে পেতাম। আনঅফিশিয়াল ফোনের দাম কম হলেও সেগুলোর সার্ভিস নিয়ে ঝামেলা আছে। তাই অফিশিয়ালি কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
যদি আপনি ২০,০০০ টাকার আশেপাশে স্লিম, সুন্দর ডিসপ্লে, আর দীর্ঘ ব্যাটারির ফোন খুঁজছেন, তাহলে Infinix Hot 60 Pro ভেবে দেখতে পারেন। গেমিং বা ক্যামেরা আপনার কাছে সবকিছুর উপরে না হলে, এই ফোন আপনাকে হতাশ করবে না।



