iQOO Z11X রিভিউ: ক্যামেরা না পারফরম্যান্স? এই বাজেটে কী পাচ্ছেন আসলে?
বাংলাদেশের স্মার্টফোন মার্কেটে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বাজেটটা এখন একটা অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আগে এই টাকায় দারুণ সব অলরাউন্ডার ফোন পাওয়া গেলেও এখন দাম বাড়ার কারণে অনেক কিছুই কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে। iQOO বরাবরই “পারফরম্যান্স ফার্স্ট” মন্ত্রে বিশ্বাসী। তাদের Z সিরিজের ফোনগুলো স্টুডেন্ট এবং গেইমারদের কাছে বেশ পছন্দের। কিন্তু নতুন iQOO Z11X কি সেই ধারা বজায় রাখতে পেরেছে, নাকি বাজেট বাড়ার সাথে সাথে প্রত্যাশার বোঝাটাও বেড়ে গেছে? ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েকদিন বেশ ভালোভাবেই নাড়াচাড়া করলাম। চলুন, আমার সেই এক্সপেরিয়েন্সটাই আপনাদের সাথে শেয়ার করি।
Design & Build Quality
iQOO Z11X হাতে নেওয়ার পর প্রথমেই যেটা খেয়াল করলাম, সেটা হলো এর ওজন। ২১৯ গ্রাম ওজন এবং ৬.৭৬ ইঞ্চির বড় ডিসপ্লের কারণে ফোনটাকে প্রথমে একটু ভারী মনে হয়েছিল। তবে পুরো ফোন জুড়ে ওজনটা সমানভাবে ছড়ানো আছে, তাই কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর আর তেমন অস্বস্তি লাগেনি। এই প্রসঙ্গে একটা মজার ব্যাপার বলি, ফোনটার পিঠে হাত রাখলে মাঝখানের দিকে একটু ফাঁপা ফাঁপা লাগে, যেন ভেতরে একটু জায়গা ফাঁকা। টিমের বাকিরাও একই কথা বলেছে, যদিও কোম্পানি তাদের ওয়েবসাইটে বেশ শক্তপোক্ত বিল্ডের দাবি করেছে। তবে ডিউরেবিলিটি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, বেশ কিছু সার্টিফিকেশনও দেয়া আছে। আর চোখে পড়ার মতো বড় আপগ্রেড হচ্ছে IP69+ রেটিং। এই দামে এত ভালো ওয়াটার প্রোটেকশন সত্যিই বিরল। বৃষ্টিতে ভিজলে বা পানিতে পড়ে গেলেও ফোনটা বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনাটা অনেক বেশি, যা এই সেগমেন্টে বিশাল একটা প্লাস পয়েন্ট।
ডিজাইনের দিক থেকেও ফোনটা ক্লিন। আমার কাছে যে Prismatic Green ভ্যারিয়েন্টটা এসেছে, সেটা দেখতে একটু আনকমন লেগেছে। Titan Black ভার্সনটায় আবার রোদে পড়লে দারুণ একটা রিফ্লেক্টিভ ম্যাট শাইন দেয়। তবে ক্যামেরা মডিউলের পাশে থাকা Dynamic Ring টা সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফিচার। নোটিফিকেশন এলে বা চার্জে দিলে এটা ব্লিংক করে, যা দেখতে আসলেই দারুণ। গতবারের Z10X-এ Noise Cancellation Mic না থাকায় অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন, এবার সেটা তারা অ্যাড করেছে, যা কল কোয়ালিটির জন্য ভালো।
সাইড মাউন্টেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানারটা পাওয়ার বাটনের সাথে লাগানো আছে। স্পিড এবং অ্যাকুরেসি দুটোই দারুণ। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বাজেটের ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরের চেয়ে এই ফিজিক্যাল স্ক্যানারটাকেই বেশি রিলায়েবল মনে করি, বিশেষ করে যারা তাড়াহুড়োয় থাকেন তাদের জন্য।
Display Experience
iQOO Z11X-এর সবচেয়ে বিতর্কিত জায়গা সম্ভবত এটাই। এই ফোনের ডিসপ্লেটাই আমার কাছে এর একমাত্র অন্ধকার দিক মনে হয়েছে। ২৫ হাজার টাকার উপর দাম দিয়ে একটা ফোন কিনছেন, আর সেখানে পাচ্ছেন ৬.৭৬ ইঞ্চির একটা IPS LCD প্যানেল, সঙ্গে 120Hz রিফ্রেশ রেট। আপনাদের মনে হতেই পারে, “এই যুগে এসেও IPS LCD?” প্রশ্নটা যৌক্তিক। অবশ্যই আপনি এই বাজেটে একটা AMOLED প্যানেল ডিজার্ভ করেন। একই বাজেটের OPPO K13 বা Redmi Note 14-এর দিকে তাকালেই AMOLED পাবেন, যা কালো রঙকে আরও গাঢ় করে এবং আরও ভাইব্রেন্ট কালার দেয়।
তবে পুরো ব্যাপারটা নেগেটিভ হলেও কিছু সুবিধাও আছে। যারা সারাদিন গেম খেলে, তাদের জন্য এই প্যানেলটা হতে পারে একটা আশীর্বাদ। এতে গ্রিন লাইনের ভয় নেই, ডিসপ্লে বার্ন-ইন হওয়ার চান্স নেই। ফোন যতই গরম হোক না কেন, প্যানেলের তেমন ক্ষতি হবে না। রোদের মধ্যে ১২০০ নিটসের মতো ব্রাইটনেস থাকায় দেখতেও তেমন অসুবিধা হয়নি। Dual Stereo Speaker এর সাউন্ড আউটপুটও বেশ জোরালো, ইউটিউব বা সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা স্পীকারের দিক থেকে ভালোই।
কিন্তু AMOLED-এর পাশাপাশি রাখলেই ফারাকটা ধরা পড়ে যায়। ডিসপ্লে সেটিংস থেকে কালার প্রোফাইল ব্রাইট করে একটু বেটার করা গেলেও, ওই AMOLED-লেভেলের পাঞ্চিনেস পাওয়া যায় না। আর সবচেয়ে বড় যে চোখে লাগার মতো বিষয়, তা হলো ফোনের চারপাশের বেজেলগুলো। আগেরবারের Z10X-এর মতো এবারও বেজেলগুলো চট্টগ্রাম হাইওয়ের মতো চওড়া, বিশেষ করে নিচের চিনটা বেশ বড়। এই প্রাইস পয়েন্টে এসে এটা দেখতে মোটেও ভালো লাগে না। HDR সাপোর্টও অনুপস্থিত, যা মাল্টিমিডিয়া লাভারদের জন্য একটা ধাক্কা। পুরো স্ক্রিন সুরক্ষা নিয়েও তেমন কোনো পরিষ্কার তথ্য কোম্পানি দেয়নি, যা একটু শঙ্কার জায়গা রেখে যায়।
Performance & Gaming
এবার আসি সেই জায়গায় যেটা iQOO Z11X-এর মূল অস্ত্র। এই ফোনের প্রাণভোমরা পারফরম্যান্স আর আমরা সেটা টেস্ট করে দেখেছি পুরোদমে। হার্ট হিসেবে আছে MediaTek Dimensity 7400 Turbo চিপসেট, আর তার সঙ্গী হিসেবে আছে UFS 3.1 স্টোরেজ ও LPDDR4X RAM। গত বছরের চিপসেটের তুলনায় এটা খুব বড় জাম্প না হলেও, UFS 3.1 স্টোরেজ বাস্তব জীবনে অ্যাপ লোডিং আর ফাইল ট্রান্সফারের সময় আসল গতি এনে দেয়।
আমরা বেশ কিছু সিনথেটিক বেঞ্চমার্ক রান করেছি (AnTuTu, Geekbench, CPU Throttling Test) আর স্কোরগুলো অনুমান মতোই এসেছে। কিন্তু সংখ্যাটা আসল কথা না, আসল কথা হলো রিয়েল-লাইফ ইউসেজ। প্রথমে খেললাম eFootball। 60 FPS-এ সুপার স্মুথ অভিজ্ঞতা, এটুকু বলাই যায়। তারপর আসল পরীক্ষা, PUBG। ম্যাক্সিমাম 60 FPS-এই সাপোর্ট করছে। এটা একটু অবাক করার মতো, কারণ আমরা অনেকেই আশা করছিলাম 90 FPS সাপোর্ট আসবে। তবে যে জিনিসটা সত্যিই ভালো লেগেছে, সেটা হলো ৪০-৫০ মিনিটের লম্বা গেমপ্লে সেশনের সময় পারফরম্যান্স একেবারে লক ছিল ৫৭-৫৮ FPS-এ। ফোনের টেম্পারেচার ম্যানেজমেন্ট দারুণ, অতিরিক্ত গরম হয়নি, ফ্রেম ড্রপও চোখে পড়েনি। গরমের দিনে এসি ছাড়া গেম খেললেও অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, যা গেইমারদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার।
গেইমারদের জন্য আরেকটি বোম্ব ফিচার হলো Bypass Charging। এর মানে, গেম খেলার সময় চার্জার লাগালে পাওয়ার সরাসরি মাদারবোর্ডে যাবে, ব্যাটারিতে গিয়ে গরম হবে না। এতে ব্যাটারি লাইফ বাঁচে আর ফোনও ঠান্ডা থাকে। এই ফিচার সাধারণত বেশি দামের গেমিং ফোনেই দেখা যায়। স্টুডেন্ট বা হেভি গেইমারদের জন্য ফোনটা যে একদম টার্গেটেড, এই ফিচার তার প্রমাণ।
Camera System
পারফরম্যান্স সেন্ট্রিক ফোনে ক্যামেরা সাধারণত “এই আছে তো” টাইপের হয়। iQOO Z11X-ও তার ব্যতিক্রম নয়, তবে কিছু চমক আছে। এখানে পেছনে দেখবেন ৫০ মেগাপিক্সেলের একটা সেন্সর আর তার পাশে ২ মেগাপিক্সেলের বোকেহ সেন্সর। মেইন সেন্সরটা দিনের আলোয় মোটামুটি কাজের ছবি তোলে, তবে স্কিন টোন একটু বুস্টেড আর স্যাচুরেটেড লাগে। Vivo-র ফোনগুলোতে যেমন ছবি প্রসেসিং হয়, অনেকটা সেরকম – মানে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড দেয়ার জন্য রেডি থাকা ফটো।
কিন্তু আসল চমক যেটা দিয়েছে, সেটা হলো সামনে আর পেছনে উভয় ক্যামেরায় 4K 30FPS ভিডিও রেকর্ডিং সাপোর্ট। এই দামের ফোনে এটা বেশ রেয়ার আর ভ্লগার বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য অনেক দরকারি একটা ফিচার। তবে EIS থাকার পরও হাঁটতে হাঁটতে ভিডিও করলে জিটারি ফুটেজ আসে, স্ট্যাবিলাইজেশন ততটা টপ-নচ নয়।
সেলফির ক্ষেত্রে বড় ইমপ্রুভমেন্ট এসেছে। এবার ৩২ মেগাপিক্সেলের একটা সেলফি ক্যামেরা দিয়েছে, যা আগের তুলনায় অনেক ভালো এবং ডিটেইল ছবি তোলে। আপনি যদি ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেন, তাহলে এই ক্যামেরা সেটআপে চলে যাবে। কিন্তু যদি আপনার ভেতরে একটুও ফটোগ্রাফির নেশা থাকে, তাহলে এটা নিয়ে কখনোই মন ভরবে না। Camera2 API-তে লেভেল থ্রি সাপোর্ট নাই, মানে জিসিএম বা থার্ড পার্টি অ্যাপ দিয়ে র-ফটো তোলার পুরো ফায়দা নিতে পারবেন না।
Battery Life & Charging
এটা iQOO Z11X-এর আরেকটা দুর্দান্ত দিক। ৭২০০ mAh-এর পাগলের মতো ব্যাটারি বসানো আছে এতে। আমাদের স্ক্রিপ্ট রাইটার আট ঘন্টা অফিসে বসে পাঁচ-ছয় ঘন্টা ধরে Discord-এ আড্ডা দিয়েছে, PUBG খেলেছে, ইউটিউব আর Netflix দেখেছে, তারপরও দিন শেষে গিয়ে ৩০-৪০% চার্জ বাকি ছিল। নরমাল বা মিডিয়াম ইউজ করলে অনায়াসে দুই দিন চোখ বন্ধ করে চালিয়ে দেয়া যায়।
বক্সে ৪৪W-এর একটা চার্জার দেয়া আছে, যেটা দিয়ে ০ থেকে ১০০% ফুল হতে প্রায় ১ ঘন্টা ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। ব্যাটারি এত বড় হওয়ায় চার্জিং টাইমটা একটু বেশি মনে হতেই পারে, কিন্তু একবার চার্জ দিলে যে নির্ভাবনার জীবন দিচ্ছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। আর iQOO-র বড় দাবি হলো, ছয় বছর পরেও এই ব্যাটারির ক্যাপাসিটি ৮০%-এর নিচে নামবে না। দাবিটা ভালো, তবে ছয় বছর এই ফোন কেউ চালাবে কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন।
Software & Features
আউট অফ দ্য বক্স, ফোনটা Origin OS 6-এর উপর ভর করে চলছে। সফটওয়্যার এক্সপেরিয়েন্সটা বেশ ফাস্ট আর ক্লিন, তবে চায়নিজ UI হওয়ার কারণে কিছু অ্যাড-অন আছে। প্রি-ইনস্টল্ড কিছু গেম আর অ্যাপ পাবেন, যেগুলো ধরে ধরে আনইনস্টল করে দিতে হবে। আনইনস্টল করার পর ফোনটা সত্যিই পরিষ্কার আর দ্রুত মনে হয়।
iQOO প্রমিস করছে ২ বছরের Android OS আপডেট এবং ৪ বছরের সিকিউরিটি প্যাচ। অর্থাৎ Android 18 পর্যন্ত পাওয়া যাবে আর সিকিউরিটি সাপোর্ট পাবেন ২০৩০ সাল পর্যন্ত। এই দামের ফোনের জন্য এটা একটা ভালো খবর।
এছাড়া সার্কেল টু সার্চ আর আরও কিছু AI ফিচার দেয়া আছে, যা কাজের। Bluetooth 5.4 আর ফিজিক্যাল প্রক্সিমিটি সেন্সর থাকায় কলের সময় ডিসপ্লে অফ হওয়ার ঝামেলা নেই। আর একটা চমক হলো, ওয়ার্নিং ছাড়া কল রেকর্ড করতে পারবেন, যা অনেকের কাজে আসবে। তবে SD কার্ড স্লট নাই, ফলে স্টোরেজ নিয়ে আগেভাগেই হিসাব করে কিনতে হবে।
Final Verdict
iQOO Z11X হলো একটা “কাঁটায় কাঁটায়” টাইপের ফোন। ২৭ থেকে ৩১ হাজার টাকা পর্যন্ত iQOO Z11X price in Bangladesh এখন অনেকের কাছে একটু চড়া মনে হতেই পারে, কারণ আগের মডেলগুলো আরও কমে আসত। কিন্তু বিবেচনা করলে দেখবেন, বাড়তি দামের বিনিময়ে IP69+ রেটিং, ৭২০০ mAh ব্যাটারি, Bypass Charging আর ঠাণ্ডা মাথার পারফরম্যান্স পাচ্ছেন।
এই ফোনটা কাদের জন্য? যারা একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা গেম খেলেন, যাদের ব্যাটারি লাইফই সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি, এবং যারা ক্যামেরার চেয়ে প্রসেসরের গতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের জন্য এটা অসাধারণ একটা ডিভাইস। যারা কলেজ-ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট, লাইফের প্রথম পাওয়ারফুল ফোন কিনতে চান, তাদের জন্যও এটা একটা দারুণ পছন্দ।
কাদের জন্য না?
যদি আপনি নেটফ্লিক্স দেখেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর রিলস বানান এবং AMOLED ডিসপ্লের পাঞ্চি রং পছন্দ করেন, তাহলে এই ফোনের IPS LCD আপনাকে হতাশ করবে। ক্যামেরা যদি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়, বিশেষ করে ইমেজ প্রসেসিং আর স্ট্যাবিলাইজেশন, তাহলে OPPO K13 বা Redmi Note 14-এর দিকে তাকানো ভালো হবে। iQOO Z11X এক কথায় বলতে গেলে, “রাফিদের মতো গেইমারদের জন্য বানানো আর “আমার মতো” মিডিয়া কনজিউমারদের জন্য বড় একটা প্রশ্নচিহ্ন। আপনার প্রায়োরিটি কী, সেটা বুঝেই সিদ্ধান্ত নিন।



