অনার ৬০০ প্রো ফ্ল্যাগশিপের ধাঁচে বাজারে আসার পর থেকেই অনেক ব্যবহারকারী খুঁজছিলেন তুলনামূলক কম খরচে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অপশন। অনার ৬০০ ঠিক সেই চাহিদার জবাব দিতে এসেছে, সঙ্গে রেখেছে প্রিমিয়াম ডিজাইন, বিশাল ব্যাটারি আর ফ্ল্যাগশিপ-গ্রেডের ক্যামেরা সেন্সর। তবে কয়েকটি জায়গায় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, যা অনেকের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। ঢাকার ধুলাবালি, গরম, বৃষ্টি আর সিলেটের আর্দ্র আবহাওয়া মিলিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহের কাছাকাছি সময় এই ফোন ব্যবহার করে দেখা গেছে এটি কেমন দৈনন্দিন জীবনে, গেমিংয়ে, ছবি তোলায় আর চার্জের ম্যারাথনে। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা যাক।
Design & Build Quality
হাতে নেওয়ার অনুভূতি ও বডি
অনার ৬০০ হাতে নেওয়ার মুহূর্তেই বোঝা যায় এটি ছোটখাটো, হাতের তালুতে পুরোপুরি বসে যাওয়া একটি ফোন। ৭.৮ মিলিমিটার পুরুত্ব আর ১৯০ গ্রাম ওজন—এই জুটিই যথেষ্ট বলে দিচ্ছে যে আরামের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার করা যাবে। ৬০০ প্রো তুলনামূলক ভারী ও কার্বি অনুভূতির হলেও এই মডেলটিতে সেই সমস্যা অনেকটাই হালকা রাখা হয়েছে। পুরোপুরি বক্সি না হলেও সামান্য গোল কোণার জন্য হ্যান্ডফিল চমৎকার।
ফ্রেম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মেটাল অ্যালুমিনিয়াম। পেছনের প্যানেল গ্লাস আর পলিকার্বনেটের মিশ্রণ—এমন এক ধরনের টেক্সচার যা টেকসইতার সঙ্গে প্রিমিয়াম ভাব এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারে পেছনে আঙুলের ছাপ পড়ে না বললেই চলে, আর রোদে ঝিলিকও মার্জিত মনে হয়। কালার অপশন তিনটি: সাদা, কালো এবং কমলা। সাদা ও কালো ভার্সন চোখে বেশ স্টাইলিশ লাগে, বিশেষ করে কালো রঙের গ্রেডিয়েন্ট ফিনিশিং অন্য লেভেলের। অন্যদিকে কমলা রঙটি দেখলেই প্রথম নজরে আইফোনের কথা মনে পড়বে, কারণ অনার একেবারে বিনা দ্বিধায় সেই ডিজাইন ভাষা কপি করেছে। যারা অরিজিনালিটি পছন্দ করেন, তাদের জন্য সাদা ও কালোই ভরসা।
ডিউরেবিলিটি ও পোর্ট
বিল্ড টেকসই হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে আইপি৬৮/৬৯ সার্টিফিকেশন। ফোনটির ওপর ঢাকার রাস্তার ধুলাবালি, ঘাম এবং হঠাৎ বৃষ্টি কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। ফোনের নিচে ও ওপরে স্টেরিও স্পিকারের গ্রিল দেখা যাচ্ছে, পাশে আছে আইআর ব্লাস্টার, যা এখনো অনেকের দৈনন্দিন জীবনের কাজে লাগে। সুখবর হলো এতে এনএফসি সাপোর্ট আছে, ফলে কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট বা ডেটা শেয়ারিং ঝামেলামুক্ত হবে।
ডানপাশে একটি অতিরিক্ত বাটন দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত ডেডিকেটেড এআই বাটন হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি ডাবল প্রেস করলে সরাসরি ক্যামেরা চালু হয়ে যায়। শুরুতে ভেবেছিলাম বাটনটি দিয়ে মাল্টিটাস্কিংও করা যাবে, তবে এখন পর্যন্ত সেই সুযোগ রাখা হয়নি। তবু দ্রুত ক্যামেরা ওপেনের জন্য চমৎকার সংযোজন। মোটকথা, ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি এই সেগমেন্টে অনার ৬০০-কে আলাদা মর্যাদা দেয়।
Display Experience
প্যানেল ও ব্রাইটনেস
সামনে বসেছে ৬.৫৭ ইঞ্চির ওলেড প্যানেল, যার রেজলিউশন ১.৫কে (১২২০ পিক্সেল) এবং রিফ্রেশ রেট ১২০ হার্জ। সর্বোচ্চ পিক ব্রাইটনেসের দাবি ৮০০০ নিট, যা বাস্তব জীবনে কখনোই কাজে আসে না। কিন্তু এইচবিএম (হাই ব্রাইটনেস মোড) ভ্যালু এতটাই বেশি যে কড়া রোদেও স্ক্রিনে কনটেন্ট স্পষ্ট বোঝা যায়। ইনডোরে যারা ঘরের আলো সরাসরি স্ক্রিনে পড়ে এমন জায়গায় বসে ফোন চালান, তারাও কোনো অসুবিধায় পড়বেন না।
রাতের বেলা অন্ধকারে ফোন টিপা ব্যবহারকারীদের জন্য বড় সুখবর—ডিসপ্লের মিনিমাম ব্রাইটনেস ১ নিট পর্যন্ত নামানো সম্ভব। ফলে চোখের ওপর চাপ পড়ে না। পিডব্লিউএম রেটিং ৩৮৪০ হার্জ থাকায় দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখে কম ক্লান্তি আসে, যা কম দামি ফোনে দেখা যায় না। এইচডিআর সার্টিফিকেশনও পাওয়া যাচ্ছে, ফলে নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবের স্ট্রিমিং কনটেন্টে রঙ ও কনট্রাস্টের ভারসাম্য ভালো থাকে।
বেজেল ও প্রোটেকশন
ডিসপ্লের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ব্যাপার হলো চারপাশের বেজেল—এমনিতে এগুলো প্রায় চোখেই পড়ে না। অনার দাবি করছে ব্ল্যাক বর্ডারের পুরুত্ব মাত্র ০.৯৮ মিলিমিটার, যা বাস্তবিকই খুবই সরু। এতই সরু বেজেল অন্য কোনো ব্র্যান্ডের ফোনে থাকলে সেটিকে আলাদাভাবে প্রশংসা করতে হয়, আর এখানে সেই অনুভূতি প্রতিবার স্ক্রিন চালু করলেই তৈরি হয়। সামনের পাঞ্চ-হোল ক্যামেরা কাটআউটটিও বেশ ছোট, কনটেন্ট দেখতে তেমন বাধা দেয় না।
সামনের গ্লাস প্রোটেকশন সম্পর্কে অনার নির্দিষ্ট কোনো কর্নিং গরিলা গ্লাসের নাম জানায়নি। বর্তমান চাইনিজ নির্মাতারা অনেক সময় নিজস্ব প্রোটেকশন লেয়ার ব্যবহার করছে, যেগুলো বাস্তবিক চাপ ও আঁচড়ে বেশ টেকসই। ফোনটি পড়ে গেলে বা চাবির সঙ্গে পকেটে রাখলে এই গ্লাস ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম, যদিও নাম শুনে আস্থা রাখার বিষয়টি ব্যক্তিগত পছন্দ।
অল্প একটু বিরক্তির জায়গা হলো ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর। এটি অবস্থান করছে স্ক্রিনের বেশ নিচের দিকে। আনলক দ্রুত হয়, কিন্তু থাম্ব নিচের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আঙুল বাড়তি চাপ অনুভব করে। সময়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া গেলেও নিত্যনতুন ব্যবহারকারীর কাছে এটি একটু অস্বস্তিকর ঠেকবে। দামি ফোনে এখন সেন্সর অনেক ওপরে দেওয়ার চল, সেদিক থেকে এটি পিছিয়ে।
Performance & Gaming
স্ন্যাপড্রাগন ৭ জেন ৪ ও বাস্তব ব্যবহার
পারফরম্যান্সের কেন্দ্রে আছে কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৭ জেন ৪ চিপসেট। মিডরেঞ্জার ফোনের জন্য এটি যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি পছন্দ। ডাইমেনসিটি চিপের তুলনায় অনেকে এটিকে মানসিক স্বস্তি হিসেবে দেখেন, যদিও দাম বাড়ানোর প্রবণতা থেকেই যায়। অনার যদি এই মূল্যে স্ন্যাপড্রাগন ৮ এস সিরিজের কোনো চিপ দিতো, তাহলে পারফরম্যান্সের জায়গাটা আরও শক্ত হতো। এখনকার দামে শুধু ৭ জেন ৪ থাকায় কিছুটা দুঃখ লাগা স্বাভাবিক।
কিন্তু যারা শুধু দৈনন্দিন জীবন ও মিডিয়াম লেভেলের গেমিংয়ে ফোন খোঁজেন, তাদের জন্য ৭ জেন ৪ মোটেও অপ্রতুল নয়। ফোনের ম্যাজিক ওএস ১০ অ্যান্ড্রয়েড ১৬-এর সঙ্গে মিলে প্রতিদিনের অ্যাপ ওপেনিং, সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজিং কিংবা ভিডিও এডিটিং সবকিছুই টানটান গতিতে হচ্ছে। দুই সপ্তাহের ব্যবহারে কোনো ল্যাগ বা স্টার্টার বাগ চোখে পড়েনি। ইউএফএস স্টোরেজ সংস্করণ স্পষ্ট না হলেও গতি দেখে ধারণা করা যায় এটি ৩.১ ভার্সন, যা এই দামে বেশ মানানসই।
গেমিং ও থার্মাল
গেমিং পরীক্ষা করা হয়েছে পাবজি ও কল অফ ডিউটির মতো জনপ্রিয় টাইটেলে। হাই সেটিংসে গেমগুলো শুরুতে কোনো ফ্রেমড্রপ ছাড়াই মসৃণ চলেছে। পাবজিতে আল্ট্রা সেটিংস দিয়ে একটানা এক ঘণ্টা খেলতে গেলে অবশ্য ধকল বোঝা যায়। ফ্রেম সামান্য ওঠানামা করতে থাকে, কারণ এই চিপসেট চরম গ্রাফিক্স লোডে স্বাভাবিকভাবেই টালমাটাল হয়ে যায়। যারা অফিস বা পড়াশোনার ফাঁকে দিনে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা গেম খেলেন, তাদের জন্য অনার ৬০০ দিব্যি কাজ দেবে। পাবজি, কল অফ ডিউটি, এমনকি কিছু ট্রিপল-এ টাইটেলেও নিম্ন-মাঝারি সেটিংসে ঠিকঠাক চলে।
তবে কেউ যদি প্রফেশনাল মোবাইল গেমার হন, সারাদিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাই-এন্ড গেম খেলতে চান, তাহলে এই ফোন না কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ। পারফরম্যান্স লেভেল সেভাবে স্থায়ী নয়।
তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনার জায়গায় কিন্তু ৭ জেন ৪ প্রশংসা কুড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় গেমিং সেশনের পরও ফোন তেমন গরম অনুভূত হয়নি। ফ্ল্যাগশিপ প্রসেসরের মতো মাথা নষ্ট করা গরম এখানে দেখা যায় না। চিপসেট স্টেবিলিটিও বেশ উঁচু, ফলে থ্রটলিংয়ের সমস্যা নগণ্য। টানা কাজ করেও ফোনের বাইরের অংশ হাতে আরামদায়কই থাকে।
Camera System
প্রাইমারি ক্যামেরা ও পোর্ট্রেট
অনার ৬০০-র ক্যামেরাই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। পেছনে মূল সেন্সরটি ২০০ মেগাপিক্সেলের ফ্ল্যাগশিপ লেভেলের, যা অনার ম্যাজিক ৮ প্রো এবং অনার ৬০০ প্রোতেও ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। দিনের বেলায় তোলা ছবির ডিটেইল অসাধারণ শার্প, ডায়নামিক রেঞ্জ প্রশস্ত এবং হাইলাইট সহজে ব্লোন আউট হয় না। ছায়ার অংশেও ডিটেইল ঠিক থাকে, যা ইমেজ প্রসেসিংয়ের দক্ষতার প্রমাণ।
কালারের দুটো মোড আছে—ডিফল্ট ভিভিড মোড এবং ন্যাচারাল মোড। ভিভিড মোডে ছবিগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য অতিরঞ্জিত রঙ তৈরি করে, যা ইউটিউবার বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের পছন্দ হবে। ন্যাচারাল মোড অনেকটাই বাস্তবসম্মত, কালার পপ কম। অনেকের কাছে এই মোডই বেশি টানবে, বিশেষ করে যারা ফটোগ্রাফির প্রাথমিক ধারণা রাখেন।
পোর্ট্রেট শটেও প্রাইমারি লেন্স অটোফোকাস আর এআই বেসড ডেপথ ম্যাপের মাধ্যমে চমৎকার ফল দেয়। আলাদা কোনো টেলিফটো পোর্ট্রেট লেন্স নেই, এটাই সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। অথচ অনার ২০০ সিরিজ থেকেই তারা টেলিফটো লেন্স দিয়ে বাজারে হইচই ফেলেছিল। এই ফোনে সেই লেন্স বাদ দেওয়াটা বড় একটা ভুল। তবু যে পোর্ট্রেট ছবি পাওয়া যায় তাতে ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার মোটামুটি নিখুঁত এবং এজ ডিটেকশনও প্রশংসনীয়। তিনটি পোর্ট্রেট প্রিসেট (ক্লাসিক, ফিল্ম, সিমুলেশন) দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মুড আনা যায়, যা ক্যাজুয়াল ফটোগ্রাফারকে অতিরিক্ত অ্যাপ ছাড়াই সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
নাইট ফটোগ্রাফি ও আল্ট্রাওয়াইড
রাতের ছবিও বেশ ভালো ওঠে। নয়া এআই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কম আলোতেও নয়েজ কমানো আর ডিটেইল ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অনার ৬০০ প্রোর সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্য ধরা পড়ে। একই প্রাইমারি সেন্সর হওয়া সত্ত্বেও চিপসেটের আইএসপি পার্থক্য ও অপটিমাইজেশনজনিত কারণে ৬০০ প্রোর লো-লাইট ইমেজগুলো বেশি উজ্জ্বল ও ডিটেইলড। তবু ৬০০ নিজেও কম আলোয় পর্যাপ্ত ভালো ছবি দেয়, রাতের ল্যান্ডস্কেপ বা পোর্ট্রেট দিব্যি নেওয়া যায়।
আল্ট্রাওয়াইড লেন্সটি ১২ মেগাপিক্সেলের, অ্যাঙ্গেল ১১২-১১৩ ডিগ্রির কাছাকাছি এবং অটোফোকাস সমৃদ্ধ। দিনের বেলায় এই সেন্সর থেকে ইউজেবল ছবি পাওয়া যায়, কালার আর ডিটেইল মোটামুটি ঠিক থাকে। কিন্তু আলো পড়তে শুরু করলেই নয়েজ ঢুকে যায়, শার্পনেস কমে যায়। ক্রিয়েটিভ ফ্রেমিংয়ের জন্য এটি কাজে দেবে, তবে এই দামে আরেকটু ভালো আল্ট্রাওয়াইড আশা করা যায়। আলাদা ম্যাক্রো বা ডেপথ সেন্সরের চেয়ে এই অটোফোকাস-সহ আল্ট্রাওয়াইড বরং বেশি কাজের।
সবচেয়ে বড় ‘মিস’ হলো টেলিফটো। ডিজিটালি এআই সুপারজুম ২.০ ব্যবহার করে ৫x থেকে ৭x পর্যন্ত মোটামুটি কার্যকর জুম পাওয়া যায়, তার ওপরে গেলে ছবি ধুয়ে যায়। ফ্ল্যাগশিপ ক্যামেরা সেন্সর দেওয়ার পরও শুধু টেলিফটোর অভাবে পুরো ক্যামেরা এক্সপেরিয়েন্স খানিকটা ভোঁতা মনে হয়।
ভিডিও রেকর্ডিং
ভিডিওর জন্য বড় প্লাস পয়েন্ট হলো তিনটি লেন্সেই (প্রাইমারি, আল্ট্রাওয়াইড, ফ্রন্ট) ৪কে ৩০ এফপিএস রেকর্ডিং সম্ভব। স্যামসাং ও শাওমির অনেক মিডরেঞ্জ ফোনে এখনো ফ্রন্ট বা আল্ট্রাওয়াইডে ৪কে দেওয়া হয় না, সেখানে অনারকে সাধুবাদ জানাতে হয়। স্ট্যাবিলাইজেশনের জন্য সিআইপিএ ৬.০ রেটিং নেওয়া হয়েছে বলে দাবি, যা ফ্ল্যাগশিপ গ্রেডের কাছাকাছি পারফরম্যান্স দেয়। হাঁটতে থাকা অবস্থাতেও ভিডিওতে কাঁপুনি নিয়ন্ত্রিত থাকে, ফোকাস ট্র্যাকিং দ্রুত। ভিডিও ব্লগিং বা সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাছে অনার ৬০০ আস্থাভাজন সঙ্গী হতে পারে।
সেলফি ক্যামেরা ৫০ মেগাপিক্সেলের। পোর্ট্রেট সেলফির ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার খুবই মুন্সিয়ানায় করা, রঙ প্রাকৃতিক থেকে গাঢ় করার অপশনও আছে। দিনের বেলা সেলফির ডিটেইল ও এক্সপোজার ভালো, তবে রাতে সামান্য নরম হয়ে যায়—তবু সোশ্যাল মিডিয়ার মানদণ্ডে ছবি পোস্টযোগ্যই থাকে।
Battery Life & Charging
ব্যাটারি লাইফ
অনার ৬০০-র ব্যাটারি ক্যাপাসিটি ৭০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার-ঘণ্টা (গ্লোবাল সংস্করণ; ইউরোপে ৬৪০০ mAh)। এটি লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারি, যা দেখে শুরুতে সিলিকন কার্বনের অভাব মনে হলেও বাস্তব ব্যাকআপ কিন্তু চোখ কপালে তোলার মতো। দীর্ঘ সময় ডিসপ্লে অন রেখে মিশ্র ব্যবহারে (সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও স্ট্রিমিং, গেমিং, ফটোগ্রাফি) ফোন আরামে দুই দিন পার করে দেয়। নির্দিষ্ট স্ক্রিন-অন টাইম মাপা হয়নি, তবে যারা আগের ৫০০০ mAh ফোন ব্যবহার করেন, তারা ব্যাটারির এই জাদুতে মুগ্ধ হবেনই।
লিথিয়াম পলিমার হওয়ায় ব্যাটারি লাইফ দীর্ঘমেয়াদেও স্থিতিশীল থাকবে এবং সিলিকন কার্বনের তুলনায় চার্জ-ডিসচার্জ সাইকেলে বেশি নির্ভরযোগ্যতার পরিচিতি আছে। পাওয়ার ইউজারদের আর পাওয়ার ব্যাংক হাতের কাছে রাখতে হবে না।
চার্জিং স্পিড
বক্সে অনার ৮০ ওয়াটের ফাস্ট চার্জার দিচ্ছে, যা এই বিশাল ব্যাটারিকে প্রায় এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে শূন্য থেকে শতভাগে নিয়ে যায়। ২৭ ওয়াট রিভার্স ওয়্যার্ড চার্জিং সাপোর্ট মানে ফোন থেকে টাইপ-সি কেবলের মাধ্যমে অন্য ডিভাইস (ইয়ারবাড, ওয়াচ) চার্জ দেওয়া যাবে। ওয়্যারলেস চার্জিং সুবিধা এবার বাদ পড়েছে—৬০০ প্রোতে যা ছিল। এই বাদ দেওয়ার পেছনে সম্ভবত দাম নিয়ন্ত্রণের চিন্তা; এবং যারা তার ছাড়া চার্জে অভ্যস্ত নন, তাদের জন্য বিষয়টি বড় কোনো ইস্যু না-ও হতে পারে।
Software & Features
ম্যাজিক ওএস ১০ ও আপডেট
অনার ৬০০ চলছে ম্যাজিক ওএস ১০-এ, যা অ্যান্ড্রয়েড ১৬-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইন্টারফেস ঝরঝরে, ব্লটওয়্যার তুলনামূলক কম। প্রি-ইনস্টলড কিছু অ্যাপ থাকলেও আনইনস্টল করা যায়। নোটিফিকেশন ম্যানেজমেন্ট, কাস্টমাইজেশন ও অ্যানিমেশন মসৃণ। ফ্ল্যাগশিপ ৬০০ প্রোতে ছয় বছরের ওএস ও সিকিউরিটি আপডেটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনার ৬০০-র ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। তবে অনুমান করা যায়, অন্তত তিনটি অ্যান্ড্রয়েড ওএস আপডেট ও চার বছরের সিকিউরিটি প্যাচ অব্যাহত থাকবে—যা এই দামের ফোনের জন্য ন্যায্য।
এআই ফিচার
সফটওয়্যারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এআই টুলস। গ্লোবাল অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলোর মধ্যে স্যামসাংয়ের পরেই হয়তো অনারের এআই ফিচারকে রাখা যায়। ফটো টু ভিডিও ফিচারে কয়েকটি স্থির ছবি সাজিয়ে অল্প সময়ের সিনেমাটিক ভিডিও বানিয়ে ফেলা যায়, যেখানে মিউজিক ও ট্রানজিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ হয়। সিনেমেটিক ভিডিও টেমপ্লেট ব্যবহার করে মুভি-গ্রেড লুক আনা যায়।
এআই ইরেজার তো আছেই—ছবির অবাঞ্ছিত বস্তু মুছে ফেলা সহজ। ম্যাজিক কালার ফিচারে পছন্দের একটি ছবির কালার গ্রেডিং কপি করে অন্য ছবিতে প্রয়োগ করা যায়, যা ইনস্টাগ্রাম ফিড থিম মেইনটেইন করতে দারুণ কাজে দেয়। ভয়েস দিয়ে সেটিংসে সার্চ করার এআই অ্যাসিস্ট্যান্টও দারুণ—বললেই খুঁজে দেবে প্রয়োজনীয় অপশন।
তবে এত ভালো কিছুর পরেও খটকা লাগে লিমিটেড টাইম অ্যাক্সেস দেখে। বেশ কিছু এআই সুবিধা ছয় মাস বা এক বছর ফ্রি থাকবে, এরপর সাবস্ক্রিপশন মডেলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এক্সক্লুসিভ ফিচারের জন্য ভবিষ্যতে ডলার খরচ করা লাগতে পারে—যা ডিভাইসের মূল্য-সংযোজনিত মূল্য অনিশ্চিত করে তোলে।
Final Verdict
অনার ৬০০ নিজেকে একরকম কমফোর্ট জোনের ফোন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যেখানে দৈনন্দিন সব কাজ, ভালো ক্যামেরা, দীর্ঘ ব্যাটারি, চমৎকার ডিসপ্লে ও আধুনিক সফটওয়্যার এক প্যাকেজে পাওয়া যায়। বিল্ড কোয়ালিটি ও আইপি রেটিং দুর্দান্ত, ডিসপ্লের ন্যারো বেজেল দেখলে প্রশংসা না করে পারা যায় না, আর ৭০০০ mAh ব্যাটারি যেকোনো পাওয়ার ইউজারের জন্য আশীর্বাদ। ক্যামেরায় টেলিফটো লেন্স না থাকাটাই একমাত্র বড় আফসোস, যার কারণে সৃজনশীল ফটোগ্রাফির সুযোগ কমে গেছে। পারফরম্যান্স দৈনন্দিন জীবনের জন্য যথেষ্ট, তবে গেমিং পাগলদের জন্য নয়।
এখন আসে দামের প্রশ্ন। Honor 600 price in Bangladesh বর্তমানে অফিশিয়ালি ৮ জিবি + ২৫৬ জিবি ভ্যারিয়েন্টের মূল্য ৬৪,৯৯৯ টাকা (১২ জিবি+২৫৬ জিবি: ৬৯,৯৯৯ টাকা), তবে আনঅফিশিয়াল বা গ্রে মার্কেটে ফোনটি ৫১,০০০ টাকার আশেপাশে পাওয়া যাচ্ছে। রিভিউ পিরিয়ডে আনঅফিশিয়াল মার্কেটেই এটি ৪৯,০০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এই আনঅফিশিয়াল দামেই ফোনটির আসল মূল্যায়ন করতে হবে। যদি কোনোভাবে দাম ৪২,০০০-৪৫,০০০ টাকার মধ্যে নেমে আসে, তবে অনার ৬০০ অসাধারণ এক চয়েস হয়ে ওঠে। সেই দামে ফ্ল্যাগশিপ সেন্সর, আইপি৬৮/৬৯, ৭০০০ mAh ব্যাটারি আর ৪কে ভিডিও—এমন কম্বিনেশন বাজারে হাতে গোনা।
যারা অনার ২০০ থেকে আপগ্রেড করতে চান বা এই প্রথমবারের মতো শক্তিশালী মিডরেঞ্জ কিনতে চান, তাদের জন্য অনার ৬০০ নিঃসন্দেহে তালিকার ওপরের দিকে থাকার মতো ফোন। শুধু টেলিফটো না থাকার আক্ষেপ আর চিপসেট নিয়ে উচ্চাভিলাষীদের সংশয় মনে রাখলেই বাকি পুরো প্যাকেজ বাজারের অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীকে টেক্কা দেয়।





