ঠিক আছে, প্রিয় টেক বন্ধুরা, আজকে যে ফোনটা নিয়ে আলাপ করবো, সেটা নিয়ে লিখতে বসে আমার মনটা আসলেই ভারী হয়ে আছে। আমরা সবাই জানি, গত কয়েক বছর ধরেই বাজেট ও মিড-রেঞ্জ স্মার্টফোন মার্কেটের অবস্থা খুব একটা ভালো না। আর এই বাজে অবস্থার একটা জীবন্ত উদাহরণ হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে Xiaomi Redmi Note 17।
Note সিরিজের নাম শুনলেই কানে যেন একটা ভরসার শব্দ বাজতো। Redmi Note 7 প্রো, Redmi Note 8 প্রো—এগুলো ছিল বাজারের রাজা, টাকা দিলে ঠিক তার চেয়েও বেশি পাওয়া যেতো। কিন্তু সময় বদলেছে। সাত-আট বছর পর এসে Redmi Note 17 সিরিজে "Value for Money" শব্দটা যেন খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। অবস্থা এতটাই করুণ যে, ফোনটা লঞ্চের পর প্রায় দুই সপ্তাহ চলে গেছে, অথচ টেক কমিউনিটিতে কোনও সাড়া শব্দ নেই। মানুষ জানেই না যে Note 17 লঞ্চ হয়ে গেছে! এটা কিন্তু গভীর কোনো সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
আমার হাতে এখন যে ইউনিট আছে, সেটা চাইনিজ ভ্যারিয়েন্ট। আর হ্যাঁ, Xiaomi Redmi Note 17 price in Bangladesh আনুমানিক BDT 28,990 এর আশেপাশে আসতে পারে বলে আমরা ধরে নিচ্ছি। এই দামের নিরিখেই ফোনটাকে পুরোপুরি জাজ করবো, তাহলে শুরু করা যাক।
Design & Build Quality
ফোনটা হাতে নেওয়ার পর প্রথম যে জিনিসটা চোখে আটকে গেল, সেটা হলো এর দেহের গড়ন। ভাই, ফোনটা অনেক মোটা আর ভারী হয়েছে। আগের জেনারেশনের Redmi Note 15 এর পাশে রাখলে মনে হবে, এটা কোন পাথরের টুকরো। একটা সময় ছিল যখন Redmi Note সিরিজ দিন দিন স্লিক হচ্ছে, আর এখন তারা উল্টো পথে হাঁটছে।
ডিজাইনের ভাষা পুরো ফ্ল্যাট, কোনও কার্ভের বালাই নাই। কার্ভ অনেকেই পছন্দ করেন না, এটা ঠিক আছে, কিন্তু ফোনটা এতটাই সিম্পল যে এটাকে Redmi-র নাম্বার সিরিজ (যেমন Redmi 17) বললে বিশ্বাস হয়ে যায়, Note সিরিজের মতো প্রিমিয়াম ফিল পাচ্ছি না একটুও। ব্যাক প্যানেলে Corning Gorilla Glass 7i দেয়া আছে, যেটা একমাত্র স্বস্তির জায়গা। পিঠে গ্লাস থাকায় হাতে নিলে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে, কিন্তু ফ্রেম পুরোপুরি প্লাস্টিক আর হ্যান্ড ফিল একদমই সাধারণ মানের। ৩০ হাজার টাকার ফোনের কাছে হাতে নেওয়ার পর তৃপ্তির একটা ব্যাপার থাকে; এটাতে সেটা একেবারেই নাই।
সামনে তাকালেই আরেকটা বিরাট ধাক্কা—বেজেল! বেজেল এত পুরু যে এটা ২০২৫ সালের ফোন মনে হয় না। বিশেষ করে চিবুকের নিচের বেজেলটা দেখলে চোখে লাগে। IP rating নিয়েও একই কাহিনী। আগের জেনারেশনে IP68 ছিল, যা পুরোদস্তুর ফ্ল্যাগশিপ কিলার ফিচার। আর এখানে নেমে এসেছে IP65 তে। অর্থাৎ, হালকা পানি ছিটেফোঁটা নেবে, কিন্তু পানিতে ডোবানোর কথা ভুলেও চিন্তা করবেন না।
আর সবচেয়ে বড় যে আঘাতটা এসেছে, সেটা হলো স্টেরিও স্পিকার নাই! নিচে একটা সিঙ্গেল ফায়ারিং স্পিকার আছে, আওয়াজ বেড়ে যায় যখন চার্জিং পোর্টে আঙুল চলে যায়। গান শোনা আর মুভি দেখার মজা পুরাই নষ্ট।
Display Experience
ডিসপ্লের সাইজ বড় হয়েছে, যা নোট নিবেদিত প্রাণ ভক্তদের জন্য খুব কার্যকরী হবে। এটা 7.0 ইঞ্চির AMOLED প্যানেল, সাথে 120Hz refresh rate আছে। স্ক্রিনের ফ্লুইডিটি ভালোই, আর Optical in-display fingerprint সেন্সরটাও (যে সেন্সরে স্ক্রিনের নিচেই আঙুল দিয়ে আনলক করা যায়) দ্রুত কাজ করে, যদিও এর পজিশন একটু নিচের দিকে হওয়ায় আঙুল টানাটানি করতে হয়।
এখন আসি আসল সমীকরণে। Redmi Note 15 সিরিজে আমরা পেয়েছিলাম 12-bit colour প্যানেল, যা দিয়ে প্রায় ৬৮ বিলিয়ন রঙের কালার আউটপুট দেখা যায়। এখানে সেটা কেড়ে নিয়ে বসিয়ে দেয়া হয়েছে 8-bit প্যানেল, যা অনেক কম কালার প্রোডিউস করতে পারে। পিক ব্রাইটনেস 1800 nits, কিন্তু বাস্তবে মনে হয়েছে এটি ১৫ সিরিজের চেয়েও খুব একটা বাড়েনি, বরং কিছু জায়গায় অনুজ্জ্বল লাগে।
সত্যি কথা বলতে, ১৮-২০ হাজার টাকার ফোনে আমরা এখন এমন মানের ডিসপ্লে আশা করি। ২৯-৩০ হাজার টাকার রেঞ্জে এটা খুবই সাধারণ একটা ডিসপ্লে, “খারাপ” বলবো না, কিন্তু “অসাধারণ” তো দূরের কথা, “ভালো” এর তকমাও যেন কষ্ট করে পেরোয়।
Performance & Gaming
এই সেকশনটা আমার কাছে সবচেয়ে কষ্টের, কারণ এখানেই বুঝা যায় Xiaomi কিভাবে চোখের পলকে সবকিছু বদলে দিয়েছে। যেখানে Redmi Note 15-এ আমরা পেয়েছি Snapdragon 6 Gen 3, সেখানে Redmi Note 17-তে আমরা পেলাম Snapdragon 4 Gen 4। নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে, এই প্রসেসরটা একেবারে নিচের ক্যাটাগরির। Snapdragon 4 সিরিজের প্রসেসরের কথা শুনলে আমার মাথায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকার ফোন ভেসে ওঠে। কিন্তু এটা বসানো আছে ৩০ হাজারের ফোনে!
আপনি যদি MediaTek Dimensity 7300 বা পুরনো Snapdragon 6 Gen 3 এর সাথে এর CPU আর GPU স্কোর মেলান, দেখবেন রীতিমতো "ডাউনগ্রেড" হয়েছে। গেইমিংয়ের সময় জিনিসটা টের পাওয়া যায়। এটা PUBG বা Call of Duty তে Smooth সেটিংস তো দেবে, কিন্তু Extreme বা HDR-এর স্বপ্ন ভুলে যান। ফোন গরম হয়, আর তখন পারফর্মেন্স একটু থ্রোটল করা শুরু করে (পারফরমেন্স একটু কমিয়ে দেয়, যাতে বেশি গরম না লাগে)। এক বছর আগের CMF Phone 2 Pro-ও গেমিংয়ে এর থেকে অনেক এগিয়ে থাকবে, আমি নিশ্চিত।
স্মৃতিশক্তিরও বারোটা বেজেছে। এখনও আমরা দেখছি LPDDR4X RAM এবং UFS 2.2 স্টোরেজ। অথচ এই বাজেটে UFS 3.1 পাওয়াটা জরুরি ছিল, যাতে অ্যাপ দ্রুত ওপেন হয় আর ফাইল ট্রান্সফার ঘড়ির কাঁটার মতো ছোটে। এখন যেটা হবে, ফোন তো স্লো হবে না, কিন্তু আপনি জানবেন যে আপনার টাকার অনেকখানি মূল্য আপনি পাচ্ছেন না। RAM আর স্টোরেজের দাম বেড়েছে বলেই মনে হচ্ছে Xiaomi ইচ্ছা করেই এই লো-গ্রেড মেমোরি দিয়ে দিচ্ছে, যাতে তাদের লাভের মার্জিন ঠিক থাকে। এটা ভীষণ হতাশাজনক।
Camera System
ক্যামেরায় আমরা ধীরে ধীরে যে অবক্ষয় দেখছি, সেটারই ধারাবাহিকতা এই ফোন। Redmi Note 17-এর পেছনে প্রধান সেন্সর একটি 50MP লেন্স। Redmi Note 15-এ যে Hunter 400 বা অন্য রিনাউন্ড সেন্সর ছিল, সেটার থেকে এটি কোনভাবেই ভালো মনে হয়নি।
দুপুরের আলোয় ছবিগুলো দেখতে মোটামুটি লাগে, Xiaomi-র মতো একটু বেশি পাঞ্চি ও স্যাচুরেটেড কালার থাকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু আলো কমে গেলেই নয়েজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ছবিতে দানাদার ভাব চলে আসে আর শার্পনেস হারিয়ে যায়। আর এটাই আপনার একমাত্র ভরসা, কারণ এখানে আল্ট্রাওয়াইড লেন্সটাই তারা গায়েব করে দিয়েছে!
সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপারটা হলো ভিডিও রেকর্ডিং। Redmi Note 15 4K 30fps ভিডিও তুলতে পারতো। অথচ Redmi Note 17 কিনলে আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে ম্যাক্সিমাম 1080p 30fps দিয়েই। ২০২৫ সালে, প্রায় ৩০ হাজার টাকা দিয়ে একটা ফোন কিনে তাতে 4K ভিডিও করার অপশন না থাকা, এটা যে কী পরিমাণ কৃপণতা সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। মনে হচ্ছে পুরো ক্যামেরা সিস্টেমটাই একটা বিশাল অজুহাত।
Battery Life & Charging
অন্ধকারে একটা উজ্জ্বল আলো যেমন হয়, Redmi Note 17-তে সেটা এর ব্যাটারি। এতক্ষণের সব অপমানের বদলা যেন এই ব্যাটারিটা দিয়ে নিয়েছে ফোনটা। এতে দেয়া হয়েছে বিশাল 8000mAh ব্যাটারি! এটা কোনো ফোন না, যেন পাওয়ার ব্যাংক।
ভারী ব্যবহার করলেও এই ফোন সহজেই দুদিন পার করে দেবে। অল্প ব্যবহার করলে হয়তো আড়াই দিনও চলে যাবে। এটাই আসলে বাজারের এখনকার ট্রেন্ড। কোম্পানিগুলো প্রসেসর, র্যাম, স্টোরেজে যতটুকু পিছিয়েছে, ব্যাটারিতে ততটাই এগিয়েছে। মনে হয় তাদের মন্ত্র হয়ে গেছে, "পারফরম্যান্স না হয় কম দিলাম, কিন্তু চার্জার থেকে দূরে রাখবো"।
45W ফাস্ট চার্জিং সাপোর্ট আছে, আর সেই চার্জারটা বক্সের ভেতরেই পাবেন, এটা একটা প্লাস পয়েন্ট। 22.5W রিভার্স ওয়ার্ড চার্জিংও আছে, মানে প্রয়োজনে বন্ধুর ফোন বা আপনার TWS ইয়ারবাডসও চার্জ দিতে পারবেন। এই পুরো ফোনের মধ্যে একমাত্র এই ব্যাটারি সেকশনটাই হলো যেখানে ১৫ সিরিজের তুলনায় সত্যিকারের বিশাল উন্নতি হয়েছে।
Software & Features
Xiaomi Redmi Note 17 রান করছে HyperOS 3-এর উপর, বেস হলো Android 16। ইউজার ইন্টারফেসের মসৃণতা নিয়ে বলার কিছু নেই। RAM ম্যানেজমেন্ট ভালো, নেভিগেশন স্মুথ। কিন্তু আবার সেই পুরনো কথা—এটা চায়না রম। চায়না রমের চেনা রোগগুলো এখানেও বিরাজ করছে। নোটিফিকেশন ডিলে, কখনো কখনো নোটিফিকেশন মিস হয়ে যাওয়া, Google Play Store ইনস্টলের বাড়তি ঝামেলা—এসব আপনার নিত্যদিনের সঙ্গী হবে, যদি আপনি বুদ্ধি করে এই ভার্সন কিনতে যান।
এছাড়া ছোট ছোট কাটব্যাকের জায়গা তো আছেই। ব্লুটুথ ভার্সনে চোখ রাখেন, যেখানে বাজারে ব্লুটুথ 5.4 চলে এসেছে, এখানে দেয়া হয়েছে ব্লুটুথ 5.1 বা 5.2, যার কানেক্টিভিটি আর রেঞ্জ তুলনামূলক কম। সফটওয়্যারের মধ্যে কোনো বিশেষ দরদ মাখানো ফিচার আমার চোখে পড়েনি। সব মিলিয়ে সফটওয়্যারের ব্যাপারটাও যেন একরাশ "নিরাশা"।
Final Verdict
আমি যদি এতক্ষণের পুরো আলোচনাকে এক লাইনে বলতে চাই, বলবো—এটাই বোধহয় ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ দামী Redmi Note। ফোনটা দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে, কারণ আমি তাদের আগের দিনের গৌরবের কথা জানি।
তারা আমাদের ২৯ হাজার টাকায় দিচ্ছে একটা বিশাল ব্যাটারি, এটা ছাড়া বলার মতো আর কিছু নেই। এর ডিজাইন নীরস, ডিসপ্লের ব্রাইটনেস ও কালার কোয়ালিটি কমানো হয়েছে, পারফরম্যান্সে সোজা ডাউনগ্রেড করা হয়েছে, 4K ভিডিও রেকর্ডিং কেড়ে নেওয়া হয়েছে আর ক্যামেরা থেকে আল্ট্রাওয়াইড পর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু ব্যাটারি বিশাল আর চার্জার বক্সে আছে বলেই কি সব ক্ষমা করে দেওয়া যায়? আমার কাছে যায় না।
আমাদের যদি কেউ প্রশ্ন করে, Xiaomi Redmi Note 17 price in Bangladesh BDT 28,990 দিয়ে বাজেটের সেরা ফোন কোনটা, আমি বলবো এটা কিনবেন না। কারণ এখন পর্যন্ত যা দেখলাম, এটা সম্পূর্ণ বাজে এক ডিল। Xiaomi চাইলেই গ্লোবাল বা বাংলাদেশি মার্কেটের জন্য ফোনটাকে বদলে ফেলতে পারে বা দাম অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে। তখন হয়তো আবার ভেবে দেখা যাবে। কিন্তু এখন, Chinese variant দেখে এটুকু বলতে পারি, এই ফোন Xiaomi-র জন্য একটা লজ্জার ব্যাপার। ভালো ঘুমানোর জন্য যেমন ভালো ব্যাটারি দরকার, তেমনি একটা ভালো ফোনের জন্যও পরিপূর্ণ "দামের মূল্য" দরকার, আর সেটার বেলায় Redmi Note 17 পুরোপুরি ফেল মেরেছে।

