নাথিং ফোন ৪বি বাজারে আসার পর থেকেই একটা প্রশ্ন সবার মুখে—নামের শেষে “B” মানে কী? অফিসিয়ালি নাথিং বলেছে, এটা শুধুই প্রোডাক্ট সেগমেন্ট বুঝানোর জন্য। কিন্তু বাস্তবতা একটু সরল: নাথিং ফোন ৩ তাদের ফ্ল্যাগশিপ, ফোন এ সিরিজ একটু কম দামি, আর ফোন বি সিরিজ আরও কম বাজেটের। সোজা বাংলায়, B মানে Budget. আর এই বাজেট ফোনটি ৩৩০ ইউরো বা ৩০০ পাউন্ড দামি হলেও বাংলাদেশে এসেছে দারুণ এক মূল্যে—Nothing Phone 4b price in Bangladesh ৬০,০০০ টাকা হতে পারে। এই দামে এমন কিছু জিনিস পাবেন যা অবাক করবে, আবার কিছু জায়গায় আপসও আছে। পুরো ফোনটা যেন এক ব্যালান্সিং অ্যাক্ট। কেমন সেই অভিজ্ঞতা? চলুন ডিটেইলে জানি।
Design & Build Quality
নাথিং ফোন ৪বি হাতে নিতেই চেনা নাথিং-স্টাইল চোখে পড়ে। পেছনের টপ হাফে আছে ট্রান্সপারেন্ট উইন্ডো, সাথে কিছু টেক্সচার, খোলা স্ক্রু, আর মেটালিক লুকের পার্টস। বাকিটা পুরোপুরি প্লাস্টিক, এবং সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তবে উপরের স্বচ্ছ অংশটা গ্লাসি ভাব দেয়, যা দেখতে খানিকটা প্রিমিয়াম মনে হয়। ফোনটির রং: নীল, কালো ও সাদা। তিনটি রঙের ফোনেই সাইডের বাটনগুলো কালো, ফ্ল্যাট ফ্রেমের সাথে দারুণ মানিয়েছে।
বিল্ড কোয়ালিটি ও অনুভূতি
পুরো ফোন প্লাস্টিক হওয়ায় হালকা, কিন্তু টেকসই অনুভূতি মোটেও ফ্ল্যাগশিপ নয়। কয়েকদিন ব্যবহার করলেই ব্লু কালার ভ্যারিয়েন্টে স্ক্র্যাচ ও দাগ পড়তে দেখেছি। সাদা ফোনে সমস্যাটা কম হবে, তবু কেস ব্যবহার না করলে দীর্ঘদিন ভালো থাকবে না। তবে IP64 রেটিং থাকায় কিছুটা পানি ছিটাকে নির্ভয়ে সামলাবে, যা এই প্রাইস ব্র্যাকেটে বড় পার্ক।
গ্লিফ লাইট এখনো চমক
নাথিং ফোনের গ্লিফ লাইট এখানেও আছে। আগের ৪এ মডেলের চেয়ে আরও উজ্জ্বল। নোটিফিকেশন আসলে এলইডির মতো জ্বলে, ভিডিও রেকর্ডের সময় রেড লাইট ইন্ডিকেটর হিসেবে কাজ করে। নিঃসন্দেহে এটাই নাথিং-এর ক্যারেক্টার। আমি ব্যক্তিগতভাবে এগুলো কম ব্যবহার করি, কিন্তু ডিজাইন ভালোবাসলে আপনার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগবে।
ভাইব্রেশন মোটর
ফোনের একটি বড় দুর্বলতা হ্যাপটিক ফিডব্যাক। ভাইব্রেশন মোটর খুবই সস্তা ধাঁচের, মার্শম্যালোর মতো নরম। টাইপিংয়ের সময় ভাইব্রেশন বাই ডিফল্ট বন্ধ থাকে, যা থেকে বোঝা যায় নাথিং নিজেও এটা জানে। প্রিমিয়াম ফোনের ক্রিস্প ভাইবের ধারেকাছেও নয়।
Display Experience
নাথিং ফোন ৪বি-তে আছে ৬.৭৭ ইঞ্চির AMOLED প্যানেল, ১২০ হার্জ রিফ্রেশ রেটসহ। রেজোলিউশন ১০৮০পি-র চেয়ে একটু বেশি, কিন্তু ১৪৪০পি-র কম, ফলে কনটেন্ট দেখতে যথেষ্ট শার্প। তবে এই ডিসপ্লে ফ্লেক্সিবল ওলেড নয়, তাই নিচের দিকে চিন একটু বেশি চওড়া। দৈনন্দিন ব্যবহারে সেটা তেমন চোখে লাগে না।
পাঞ্চি কালার আর স্মুথনেস
স্ক্রিনটি হাই কনট্রাস্ট, কালার ভালোমতো চোখে লাগে, বাইরেও মোটামুটি রিডেবল। কিন্তু অ্যান্টি-গ্লেয়ার ফিনিশিং একটু দুর্বল, দামি ফোনগুলোর মতো নয়। তবু হাই রিফ্রেশ রেটের কারণে স্ক্রলিং স্মুথ, আর হাই ফ্রিকোয়েন্সি PWM ডিমিং থাকায় চোখের আরাম বজায় থাকে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও টাচ রেসপন্স
ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরটি অপটিক্যাল, আলট্রাসোনিক নয়। অবস্থান একটু নিচের দিকে, তাই পৌঁছাতে একটু অসুবিধা হয়, স্পিডও মোটামুটি। কিন্তু গেমিং বা রেসপন্সিভনেসের জন্য টাচ স্যাম্পল রেট ১০০০ হার্জ, যা ক্লাসের সেরা। ডিসপ্লের ফান্ডামেন্টালস মোটের ওপর ভালো, দেখতেও লাগে দারুণ।
Performance & Gaming
ফোনের প্রাণভোমরা Snapdragon 6 Gen 4 চিপসেট। এটি মাঝারি-নিম্ন সেগমেন্টের প্রসেসর। বেঞ্চমার্ক বলছে, পারফরম্যান্স প্রায় সাত বছর আগের OnePlus 7 Pro-র মতো। তবে GPU আগের চিপগুলোর থেকে ভালো আধুনিক, আর ভেপার চেম্বার থাকায় সাসটেইন্ড পারফরম্যান্স ঠিক রাখে। গেমিং করতে পারবেন, তবে সেটা একেবারে ফ্ল্যাগশিপ লেভেলে নয়।
সফটওয়্যারের জাদুতে রেসপন্সিভনেস
প্রথমবার ফোন চালু করতেই Nothing OS 4.1 আপডেট পেয়েছি। ইনস্টলের পর থেকে এক্সপেরিয়েন্স দারুণ স্মুথ। নাথিং নিজস্ব কাস্টম CPU শিডিউলার ব্যবহার করেছে, যার ফলে অ্যাপ ওপেনিং স্পিড ও অ্যানিমেশন দ্রুত। মাঝে মাঝে চিপের সীমাবদ্ধতায় স্টাটার হয় বটে, কিন্তু সার্বিক ইউআই ফ্লুইডিটি প্রাইস পয়েন্টের তুলনায় টপ নচ।
গেমিং ও স্টোরেজ স্পিড
PUBG বা ফ্রি ফায়ারের মতো গেম মিডিয়াম গ্রাফিক্সে ভালোই চলে। স্টোরেজ UFS 2.2 হওয়ায় ফাইল ট্রান্সফার বা বড় গেম লোড হতে একটু সময় নেয়। দীর্ঘমেয়াদি ভাবলে এই চিপ ও স্লো স্টোরেজ ৫-৬ বছর পর বয়স বুঝিয়ে দেবে, তবে এখনকার দিনে মোটামুটি স্বচ্ছন্দ।
প্রতিযোগীদের তুলনায়
একই দামে রেডমি বা রিয়েলমি ফোনে MediaTek Dimensity 7000 সিরিজের চিপ পেতে পারেন, যারা বেঞ্চমার্কে এগিয়ে। কিন্তু নাথিং-এর সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন সেই ব্যবধান অনেকটাই ঘুচিয়ে দেয়। সারাদিনের ব্যবহারে পার্থক্য তেমন টের পাবেন না।
Camera System
নাথিং ৪বি-তে কোনো আজেবাজে তৃতীয় ক্যামেরা নেই। আছে ৫০ মেগাপিক্সেল প্রাইমারি ও ৮ মেগাপিক্সেল আলট্রা-ওয়াইড। প্রাইমারি ক্যামেরাটি ছোট সাইজের Samsung সেন্সর, তবে OIS আছে। দিনের আলোতে ছবি বেশ সুন্দর ওঠে। কালার ন্যাচারাল, ডিটেইলস যথেষ্ট। কিন্তু আলো কমলেই শাটার স্পিড কমে যায়, নয়েজ বাড়ে, রং একটু ফিকে হয়ে যায়।
আলট্রা-ওয়াইডের বাস্তবতা
৮ মেগাপিক্সেলের আলট্রা-ওয়াইড ক্যামেরার কোণায় কখনোই পুরোপুরি শার্পনেস আসে না, যতই ভালো আলো হোক। তবু এটি থাকাটা না থাকার চেয়ে ভালো—এমন দামে অতিরিক্ত ভিউ দেবে, এইটুকুই লাভ। ভিডিও রেকর্ডিং এভারেজ, ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন কাজ করে।
কাদের জন্য যথেষ্ট?
আপনার যদি প্রধান চাহিদাই ক্যামেরা হয়, তাহলে Pixel 10a বা পুরনো কোনো ফ্ল্যাগশিপের দিকে তাকানো ভালো। তবে সোশ্যাল মিডিয়া আর নৈমিত্তিক ফটোগ্রাফির জন্য এই ক্যামেরা সেটআপ মোটেও ডিলব্রেকার নয়। প্রাইমারি ক্যামেরা সফটওয়্যার টিউনিং-এর বদৌলতে অনেক সময় চমক দেয়।
Battery Life & Charging
এটাই সম্ভবত ফোনটির সবচেয়ে বড় হাইলাইট। বাংলাদেশে আসা মডেলটিতে ব্যাটারি ৬০০০ mAh (ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্টের মতো), যা বিশাল। ৫২০০ mAh গ্লোবাল ভার্সনের চেয়ে অনেক ভালো। চার্জিং ৩৩ ওয়াট ওয়্যার্ড, ওয়্যারলেস চার্জিং নেই। কিন্তু ফুল চার্জে দেড় থেকে দুই দিন আরামে চলে, লাইট ইউজে পুরো দুই দিনও চলে যায়।
চার্জিং স্পিড বনাম ব্যাটারি লাইফ
৩৩ ওয়াট চার্জিং বড় ব্যাটারির জন্য একটু সময় নেয়, তবে একবার চার্জ দিয়ে যে আত্মবিশ্বাস পাবেন সেটা অসাধারণ। পাওয়ার ইউজাররাও বিকেল পর্যন্ত নির্ভাবনায় থাকতে পারেন। পাওয়ার ব্যাংকের চিন্তা প্রায় ভুলতে পারেন। ওয়্যারলেস চার্জিং না থাকা খারাপ লাগলেও, দাম বিবেচনায় মেনে নেওয়া যায়।
Software & Features
Nothing OS 4.1 প্রায় স্টক অ্যান্ড্রয়েডের কাছাকাছি, তবে নাথিং-এর নিজস্ব ডট ম্যাট্রিক্স ডিজাইন, কাস্টম উইজেট, আইকন প্যাক, আর ফন্ট সবকিছু মিলিয়ে দারুণ ব্যক্তিত্ব। কোনও ব্লটওয়্যার নেই, অ্যানিমেশন স্মুথ। এই ফোনেও ফ্ল্যাগশিপের মতোই Essential Space আর AI টুলকিট পাচ্ছেন, যা নোট জেনারেশন ও স্মার্ট ড্রয়ার সুবিধা দেয়।
গ্লিফ লাইটের ব্যবহারিকতা
গ্লিফ লাইট কাস্টমাইজ করে বিভিন্ন নোটিফিকেশনের জন্য আলাদা প্যাটার্ন সেট করা যায়। ভলিউম ইন্ডিকেটর, চার্জিং প্রোগ্রেস ইত্যাদিও দেখায়। কেউ কেউ এটাকে জিমিক বলবেন, কিন্তু নাথিং ফ্যানদের কাছে এটা আইডেন্টিটি। ভিডিও রেকর্ডিংয়ে লাল বাতি প্রোফেশনাল টাচ আনে।
আপডেট ও লং টার্ম
নাথিং সফটওয়্যার আপডেটে প্রতিশ্রুতিশীল। নিয়মিত সিকিউরিটি প্যাচ আর OS আপগ্রেড পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। তবে UFS 2.2 স্টোরেজ আর Snapdragon 6 Gen 4 ভবিষ্যতের ভারী আপডেটে ধুঁকতে পারে, এটা মাথায় রাখতে হবে।
Final Verdict
Nothing Phone 4b মূলত তরুণদের জন্য নাথিং ইকোসিস্টেমে ঢোকার সবচেয়ে সাশ্রয়ী টিকিট। আপনি যদি একঘেয়ে ডিজাইনের বাইরে কিছু চান, স্মুথ সফটওয়্যার আর দারুণ ব্যাটারি লাইফ প্রাধান্য পান, তাহলে ৬০,০০০ টাকায় এটি একেবারে সঠিক পছন্দ। ক্যামেরা মোটামুটি, পারফরম্যান্স মাঝারি—কিন্তু এই প্রাইসে এর চেয়ে ভালো “নাথিং-এক্সপেরিয়েন্স” আর কোথাও পাবেন না।
প্রতিদ্বন্দ্বী ফোনগুলোর কথা ভাবলে, Samsung Galaxy M55 বা OnePlus Nord CE সিরিজ পারফরম্যান্সে এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু নাথিং-এর ডিজাইন ও সফটওয়্যার ইউনিকনেস তাদের নেই। ফোনটি তাদের জন্য যারা স্পেসিফিকেশন শিটের বাইরে গিয়ে ফোনের ব্যক্তিত্বকে ভালোবাসেন। কেউ যদি বলেন বাজেট ফোন বলে আপস করতে হবে, নাথিং ৪বি হাতে নিয়ে সেটা পুরোপুরি মনে হবে না। বরং বলবেন, দারুণ তো!

