ঠিক ধরেছেন। আজ আমরা কথা বলব এমন একটা স্মার্টফোন নিয়ে, যেটা নিয়ে বাজারে বেশ শোরগোল পড়ে গেছে। হঠাৎ করেই মটোরোলা একটা দারুণ চমক দেখিয়েছে, বিশেষ করে যারা কম বাজেটে ঝড়ের গতি চান তাদের জন্য। ফোনটার মডেল Motorola Moto G57 Power। নামের মধ্যেই ‘Power’ শব্দটা জুড়ে দিয়ে কোম্পানি পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছে, এটা একটা এনার্জি হাউস। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মাত্র ২২ হাজার টাকার আশেপাশে এটা কি আসলেই সেরা? নাকি এর পেছনে কিছু ঘাটতি লুকিয়ে আছে? চলুন, একদম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু জেনে আসি।
Design & Build Quality
প্রথম দেখাতেই মনে হবে, আরে এটা তো চেনা চেনা লাগছে। মটোরোলা ইদানীং তাদের প্রায় সব ফোনেই একই রকম ডিজাইন ফলো করছে, আর এই G57 Power-ও তার ব্যতিক্রম নয়। ফোনটা হাতে নিলেই প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়বে, সেটা হলো এর পিছনের প্যানেল। এখানে ইকো লেদার (Eco Leather) ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে এই জিনিসটা আমার দারুণ লাগে! চকচকে প্লাস্টিকের চেয়ে এই লেদার ফিনিশ অনেক বেশি প্রিমিয়াম মনে হয়, হাতে ঘামও কম লাগে, আর ফোনটা পিছলে যাওয়ার ভয়ও থাকে না।
ফ্রেমটা অবশ্য পুরোটাই প্লাস্টিকের, তবে ফিনিশিং এতটাই সুন্দর যে কমপ্লেইন করার কিছু নেই। ভলিউম রকার আর পাওয়ার বাটনটা ডান পাশেই আছে, আর পাওয়ার বাটনের সঙ্গেই ইন্টিগ্রেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর। এটার রেসপন্স বেশ ফাস্ট।
এবার আসি সবচেয়ে বড় চমকে। এই ফোনে আছে Military Standard 810H সার্টিফিকেশন। এর মানে কী? খুব সোজা বাংলায়, ফোনটা বেশ শক্তপোক্ত। হাত থেকে পড়ে গেলেও ভেতরের পার্টস নষ্ট হওয়ার চান্স অনেক কম। সাথে আছে IP64 রেটিং, অর্থাৎ ধুলো-বালি আর ছিটেফোঁটা পানি থেকে এটা বাঁচবে। তবে পুরো ডুব মারার কথা ভাববেন না। একটা বড় ধাক্কা হচ্ছে, এই দামেও ফোনটিতে NFC সাপোর্ট নেই। কাজেই কন্টাক্টলেস পেমেন্ট বা দ্রুত ডেটা শেয়ার করার সুবিধাটা এখানে পাবেন না। আর চিন্তা নেই, 3.5mm হেডফোন জ্যাকটা ঠিকই রাখা হয়েছে!
Display Experience
এই জায়গাতেই এসে একটু মন খারাপ হবে। কারণ চারপাশে এত ভালো করার পর মটোরোলা ডিসপ্লেতে এসে একটু কৃপণতা করেছে। এখানে একটা IPS LCD প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এটা কি খারাপ? একদমই না। ফুল এইচডি প্লাস রেজোলিউশন বেশ শার্প, আর 120Hz রিফ্রেশ রেটের কারণে স্ক্রলিং করার এক্সপেরিয়েন্সটা সিল্কি মসৃণ লাগে। IPS প্যানেল হওয়া সত্ত্বেও এর কালার রিপ্রোডাকশন আর ব্রাইটনেস ভালোই। ইনডোরে ১৫০০ নিটসের মতো ব্রাইটনেস পাবেন, যা যথেষ্ট।
কিন্তু যখনই চোখ পড়বে, চোখ আটকে যাবে ওই নিচের চিবুকের দিকে। ফোনটার নিচের বেজেল বা ‘চিন’ অনেকটাই মোটা। বন্ধুরা, সত্যি বলতে ২৫,০০০ টাকার কাছাকাছি প্রাইসের একটা ফোনে এত মোটা বেজেল দেখতে একটু বেমানান লাগে। এটাকে দেখলে ১২-১৩ হাজার টাকার ফোনের মতো মনে হয়। যারা এই মুহূর্তে AMOLED ডিসপ্লের সঙ্গে তুলনা করবেন, তাদের বলব, IPS LCD-এর নিজস্ব একটা ভালো দিক আছে — এতে গ্রিন লাইন পড়ার কোনো ভয় নেই! নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়। কিন্তু তবুও, এই মোটা বেজেলটা অনেকের কাছেই ডিলব্রেকার হতে পারে।
Performance & Gaming
এবার আসি মজার জায়গায়। এটাই এই ফোনের আসল ‘পাওয়ার’। এই বাজেটে মটোরোলা ব্যবহার করেছে Qualcomm Snapdragon 7s Gen 2 চিপসেট। যারা চিপসেটের হিসাব কম বোঝেন, তাদের জন্য বলি, এই একই প্রসেসর আমরা দেখেছিলাম Motorola Edge 50 Fusion ফোনে, যার দাম ৩০,০০০ টাকারও বেশি! স্রেফ এই জিনিসটাই এটাকে ভ্যালু ফর মানি বানায়।
4nm টেকনোলজির এই প্রসেসরটা দারুণ ব্যালেন্সড। নেট চালাচ্ছেন, ভিডিও দেখছেন, নাকি সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করছেন, সবকিছু লিকলিকে চলবে। অ্যাপ ওপেন-ক্লোজ করা থেকে শুরু করে মাল্টিটাস্কিং, 8GB RAM আপনার জন্য এনাফ মনে হবে। হ্যাঁ, এটা একদম ফ্ল্যাগশিপ স্পীড না, একটু মৃদু দেরি হয়, কিন্তু বিরক্তিকর নয়।
গেমিং নিয়ে এতক্ষণেই প্রশ্ন আসার কথা। PUBG বা Free Fire? আরামসে খেলবেন। হাই সেটিংসে গেলেও খেলা যায়, তবে আমি সুপারভ করব স্মুথ এক্সট্রিম সেটিংসে খেলার জন্য। কারণ হাই গ্রাফিক্সে গরমের সময় বা ভারী মোমেন্টে একটু মাইক্রো স্টাটার ল্যাগ করতে পারে। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড সেটিংসে গেমপ্লে অসাধারণ স্টেবল থাকে। আর হিট ম্যানেজমেন্ট? বাজিমাত! এই চিপ মিডিয়াটেকের Dimensity 7400-এর তুলনায় অনেক কম গরম করে এবং ব্যাটারিও কম খায়। যারা একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেম খেলে, তাদের জন্য এটা একটা বড় প্লাস পয়েন্ট।
Camera System
এবার আসা যাক ক্যামেরায়। পেছনে তিনটা ক্যামেরা দেখে খুশি হবেন ঠিকই, কিন্তু মনে রাখবেন, এখানে একটা লেন্স পুরাই ডামি বা ফেইক। কাজের মধ্যে আছে 50MP Main Sensor (LYTIA 600) আর 8MP Ultrawide।
দিনের আলোতে মেইন ক্যামেরাটা বেশ ইউজেবল ছবি তোলে। ডিটেইল মোটামুটি অন পয়েন্ট থাকে। তবে আমি একটা জিনিস খেয়াল করলাম, মটোরোলা এখানে কালার নিয়ে একটু বেশি ছেলেখেলা করেছে। ছবিগুলো বেশ ভাইব্রেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য একদম রেডি-টু-পোস্ট। কিন্তু কখনও কখনও এই ভাইব্রেন্স এতটাই বেড়ে যায় যে ছবিটা দেখে ওভার-স্যাচুরেটেড বা বাড়াবাড়ি রকমের রঙিন মনে হয়। এটা আমার ব্যক্তিগতভাবে একটু খটকা লেগেছে। অনেকেই অবশ্য এই পাঞ্চি কালার পছন্দ করেন। লো লাইটে কনট্রাস্ট অনেক বাড়িয়ে দেয়, ফলে ডিটেইল একটু হারিয়ে যায়। নাইট মোড অন করলে সিচুয়েশন একটু ভালো হয়, তবে তখন হাত একদম স্টেডি রাখতে হবে।
আল্ট্রাওয়াইড ক্যামেরাটা ডে লাইটে চলনসই, কিন্তু খুব বেশি ডিটেইল আশা করবেন না। লো লাইটে এটা দিয়ে বিশেষ কিছু করা যাবে না। পোর্ট্রেট মোডে ফোকাল লেন্থ অপশন একটাই, যেখানে এখনকার দিনে অনেক বাজেট ফোনই একাধিক অপশন দিচ্ছে। এজ ডিটেকশন ঠিকঠাক আছে, তবে ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লারটা একটু আর্টিফিশিয়াল মনে হবে, ডিএসএলআর ক্যামেরার মতো ন্যাচারাল নয়। স্কিন টোনেও একটু কেমন কেমন জানি একটা আর্টিফিশিয়াল ভাব আসে।
ফ্রন্ট ক্যামেরা 32MP-র, যা এই দামে ভাবা যায় না। পর্যাপ্ত আলো পেলে সেলফির ডিটেইল দারুণ আসে। কিন্তু লো লাইটে একটু বেশিই সফট করে ফেলে, যেন ফেসে বিউটিফিকেশন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভিডিও বেলায় ফোনটা 4K 30fps রেকর্ড করে, ফ্রন্ট আর রেয়ার দুটোতেই। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করলে কোয়ালিটি ভালো লাগবে। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে ভিডিও করলে বুঝবেন ইলেকট্রনিক স্ট্যাবিলাইজেশন (EIS) খুব একটা হেল্প করছে না, একটা জিটারিং ফিল হবে। কম আলোয় লেন্স ফ্লেয়ারের একটা ইস্যুও আছে।
Battery Life & Charging
নামের মধ্যে ‘Power’ আছে, কাজেই ব্যাটারি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা তুঙ্গে থাকাটাই স্বাভাবিক। আর এখানে এসে ফোনটা আপনাকে হতাশ করবে না। এই ফোনে আছে বিশাল এক 7000mAh-র ব্যাটারি। এটাই এর সবচেয়ে বড় সেলিং পয়েন্ট।
একবার চার্জ দিয়ে আপনি অনায়াসে নয় ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন-অন টাইম পাবেন। নরমাল ইউসেজে তো এটা আরামসে দেড় দিন চলে যাবে। যারা সারাদিন বাইরে থাকেন, গেম খেলেন, মুভি দেখেন, তাদের জন্য এটা স্বর্গরাজ্য। চার্জিং স্পীড 30W-এর। ৭০০০ এমএএইচ ব্যাটারির তুলনায় এটাকে একটু ধীর বলাই যায়। তবে দামের কথা মাথায় রাখলে অভিযোগ করা যায় না। বক্সের ভেতরেই চার্জার পেয়ে যাবেন, এটা একটা বড় প্লাস পয়েন্ট।
Software & Features
Motorola Moto G57 Power বক্স থেকেই Android 15-এ রান করে। আর এটা হলো মটোরোলার আরেকটা বড় জায়গা। এখানে ইউজার এক্সপেরিয়েন্সটা একদম ক্লিন, প্রায় স্টক অ্যান্ড্রয়েডের মতো মনে হবে। বিরক্তিকর অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বা ‘ব্লোটওয়্যার’ বলতে কিছু নেই বললেই চলে।
কোম্পানি কথা দিচ্ছে ৩টা মেজর অ্যান্ড্রয়েড আপডেট দেবে, মানে Android 18 পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তা খোলা। UI টা সিম্পল, ফাস্ট আর ব্যবহার করতে বেশ আরামদায়ক। এত সহজ আর ঝরঝরে সফটওয়্যার পাবেন বলে অনেকেই অনেক দামি ফোন ছেড়ে মটোরোলা পছন্দ করেন। স্টেরিও স্পিকার আছে, শব্দ বেশ লাউড হয়, তবে মানের দিক থেকে খুব বেশি বাজিমাত করে না, বাজেট অনুযায়ীই ঠিকঠাক। নেটওয়ার্ক কানেক্টিভিটি নিয়েও কোনো সমস্যা পাইনি।
Final Verdict
মটোরোলা এই ফোনটাতে এমন একটা মিক্স এনেছে যে, সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। Motorola Moto G57 Power-এর বর্তমান আনঅফিশিয়াল দাম বাংলাদেশে দাঁড়িয়েছে 8GB+128GB ভ্যারিয়েন্টের জন্য মাত্র ৳২৫,৫০০। হ্যাঁ, কিছু দোকানে দাম একটু কম-বেশি হতে পারে, তবে ২২-২৫ হাজার টাকার মধ্যে এটা একটা রীতিমতো পাওয়ার হাউস।
কার জন্য ফোনটা একদম পারফেক্ট? যারা পারফরম্যান্স চান, দুর্দান্ত ব্যাটারি লাগবে, আর সফটওয়্যার ইউজ করতে চান ঝরঝরে — তাদের জন্য এই ফোন দারুণ। যারা গেমিং করতে পছন্দ করে, গরম না হওয়া, ব্যালেন্সড প্রসেসর আর বড় ব্যাটারি তাদের আনন্দ দেবে।
তবে কার জন্য না? যাদের ডিসপ্লে মানেই AMOLED, আর চারপাশে বেজেল একদম নাই বলে মনে হবে, তাদের জন্য এটা ভুল পছন্দ হবে। ছবির কালার যদি ন্যাচুরালের চেয়ে পাঞ্চি হয়, সেটা যাদের সহ্য হয় না, তারাও একটু ভাববেন।
সবশেষে বলব, Motorola Moto G57 Power একটা অসাধারণ ডিসপ্লের অভাবে পুরোপুরি কিংবদন্তি হতে পারল না। কিন্তু পারফরম্যান্স আর ব্যাটারির জগতে এই বাজেটে এটাকে টেক্কা দেওয়া কঠিন। আমার কাছে মনে হয়েছে, ছোটখাটো কমতি স্বীকার করেও ফোনটা দারুণ একটা প্যাকেজ। আপনার কী মনে হয়?



