লিখেছেন TechReviews Editorial · · আপডেট:

ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ নতুন নিয়ম: ৪৮ দল কীভাবে খেলবে? সম্পূর্ণ ফরম্যাট বাংলায়
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব নিয়ে একটা দারুণ খবর শুনো! ২০২৬ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ হতে যাচ্ছে। ৪৮টি দল! চিন্তা করতে পারো? ছোটবেলায় যে টুর্নামেন্টে ৩২ দলের খেলা দেখে রাত জেগেছি, সেটা হুট করে ৫০% বেড়ে গেল। কিন্তু এই হঠাৎ বৃদ্ধির পেছনে কারণ কী? আর এতগুলো দল নিয়ে খেলাটা ঠিক কীভাবে হবে? গ্রুপ স্টেজ থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত হিসাব-নিকাশটা দারুণ জটিল মনে হচ্ছে, তাই না? চিন্তা নেই, বন্ধুকে বোঝানোর মতো করেই আজ আমরা সব জটিলতা গুছিয়ে ফেলব। এই আর্টিকেলে আমরা জানব ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ নতুন নিয়ম, ফরম্যাট, ভেন্যু এবং বাংলাদেশ থেকে সরাসরি খেলা দেখার পুরো প্ল্যান।
ফিফা এই প্রথমবার ৩২ দলের গণ্ডি পেরিয়ে ৪৮ দলের পাগলামোটা করছে। কিন্তু হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে বড় কারণ আছে।
কেন ৪৮ দলে গেল ফিফা? প্রথমত, ফিফা চায় ফুটবল সত্যিকারের একটি "গ্লোবাল" গেম হোক। আগের ফর্ম্যাটে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দাপট বেশি ছিল। এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকা থেকে অনেক দল যোগ্যতা অর্জন করেও সুযোগ পেত না। দ্বিতীয়ত, বেশি দল মানে বেশি ম্যাচ, আর বেশি ম্যাচ মানে ফিফার জন্য বিশাল অঙ্কের রেভিনিউ। কিন্তু ব্যবসা বাদ দিলে, আমাদের মতো ফুটবলপাগা দর্শকদের জন্য এটা একটা দারুণ সুযোগ, কারণ অনেক নতুন দেশকে আমরা বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখতে পাব।
নতুন কোন দেশগুলো আসছে? যেহেতু স্লট বেড়েছে, এশিয়া (AFC) পাচ্ছে ৮টি করে স্লট, যেখানে আগে ছিল ৪.৫। আফ্রিকা (CAF) পাচ্ছে ৯টি স্লট (আগে ৫)। এর মানে বাংলাদেশের প্রতিবেশী বা আমাদের চেনা অনেক দলকেই হয়তো আমরা মূলপর্বে দেখতে পাব। নিউজিল্যান্ডের মতো ওশেনিয়া অঞ্চলের দলও এখন সহজে সরাসরি সুযোগ পাবে।
সহজ তুলনা: আগে vs. এখন নিচের টেবিলটা দেখলেই পুরো চিত্রটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে:
| বিষয় | আগের ফরম্যাট (কাতার ২০২২) | ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ নতুন নিয়ম |
|---|---|---|
| মোট দল | ৩২ টি | ৪৮ টি |
| গ্রুপ সংখ্যা | ৮ টি (A থেকে H) | ১২ টি (A থেকে L) |
| প্রতি গ্রুপে দল | ৪ টি | ৪ টি |
| গ্রুপে ম্যাচ | ৪৮ টি | ৭২ টি |
| নকআউট রাউন্ড | রাউন্ড অফ ১৬ থেকে শুরু | রাউন্ড অফ ৩২ থেকে শুরু |
| মোট ম্যাচ | ৬৪ টি | ১০৪ টি |
অনেকে গুজব শুনেছেন FIFA হয়তো ১৬টি গ্রুপ করবে (প্রতি গ্রুপে ৩ দল করে)। কিন্তু FIFA নিশ্চিত করেছে যে পুরোনো ৪ দলের গ্রুপ পদ্ধতিই থাকছে। এটাই দর্শকদের জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর।
১২টি গ্রুপ, প্রতি গ্রুপে ৪টি দল মোট ৪৮টি দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হবে (Group A থেকে Group L)। প্রতিটি গ্রুপে থাকবে ৪টি করে দল। রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে প্রতিটি দল গ্রুপে ৩টি করে ম্যাচ খেলবে। মানে, তুমি যদি ব্রাজিলের সাপোর্টার হও, গ্রুপ স্টেজেই তোমার টিমের অন্তত ৩টি ম্যাচ দেখার সুযোগ পাবে।
Knockout-এ যাবে কারা? এখানেই আসল মজা এবং নতুন নিয়মের ছন্দপতন। ১২টি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন (১২ দল) এবং রানার্সআপ (১২ দল) সরাসরি next round-এ যাবে। তাহলে তো ২৪ দল হয়ে গেল, ৩২ দলের নকআউট রাউন্ড হবে কীভাবে?
বাকি ৮টি জায়গা পূরণ করবে সেরা ৮টি তৃতীয় স্থানাধিকারী দল। মানে, গ্রুপে যারা তিন নম্বরে থাকবে, তাদের পয়েন্ট, গোল পার্থক্য ইত্যাদি তুলনা করে সেরা ৮ দলও সুযোগ পাবে। এতে বড় দলগুলো গ্রুপ স্টেজে একটু খারাপ করলেও একবারে ছিটকে যাওয়ার ভয় থাকবে না।
উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক ধরো, গ্রুপ 'E' তে আছে আর্জেন্টিনা, আফ্রিকার কোনো শক্তিশালী দল, এশিয়ার একটি দল এবং ওশেনিয়ার নিউজিল্যান্ড।
এটাই এই ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফরম্যাট-এর সবচেয়ে বড় চমক।
আগে ৩২ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব শেষে সেরা ১৬ দল নিয়ে সরাসরি প্রি-কোয়ার্টার শুরু হতো। কিন্তু ২০২৬-এ আমরা পাচ্ছি একেবারে নতুন একটি রাউন্ড: রাউন্ড অফ ৩২। এর মানে, টুর্নামেন্টে ১টি অতিরিক্ত ধাপ যোগ হলো, যা রোমাঞ্চকে তুঙ্গে নিয়ে যাবে।
ধাপে ধাপে নকআউট রোডম্যাপ:
১. Round of 32 (৩২টি দল): এটা হবে বিশাল এক যুদ্ধ। ২৪টি দল (গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ) + ৮টি সেরা তৃতীয় স্থানাধিকারী দল এখানে মুখোমুখি হবে। এই পর্বে ১৬টি ম্যাচ হবে।
২. Round of 16 (১৬টি দল): রাউন্ড অফ ৩২-এর বিজয়ী ১৬টি দল এখানে খেলবে। এই পর্বটাই আগের "প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল" হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে ৮টি ম্যাচ হবে।
৩. Quarter-finals (৮টি দল): শেষ আটের লড়াই। চেনা ফরম্যাট। ৪টি ম্যাচ।
৪. Semi-finals (৪টি দল): সেমিফাইনাল মানেই উন্মাদনা। ২টি ম্যাচ।
৫. Third Place Match ও Final: সেমিতে হারা দল তৃতীয় স্থানের জন্য লড়বে, আর বাকি দুই চ্যাম্পিয়ন ট্রফির জন্য মুখোমুখি হবে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: পুরো টুর্নামেন্টে মোট ম্যাচের সংখ্যা হবে ১০৪টি। আগে যা ছিল ৬৪টি। প্রায় দ্বিগুণ ফুটবল! গোটা পৃথিবী এক মাসের বেশি সময় ধরে ফুটবল উন্মাদনায় ডুবে থাকবে।
ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ নতুন নিয়ম শুধু ফরম্যাটেই নয়, আয়োজনেও। ইতিহাসে প্রথমবার তিনটি দেশ একসঙ্গে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে: যুক্তরাষ্ট্র (USA), কানাডা (Canada) এবং মেক্সিকো (Mexico)। মেক্সিকো এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করবে, যা আরেক রেকর্ড।
Total Venue: মোট ১৬টি ভেন্যুতে খেলা হবে।
ফাইনাল ম্যাচ কোথায় এবং কবে? বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। নির্ধারিত তারিখ জুলাই ১৯, ২০২৬। এই একটি দিনের জন্য পুরো বিশ্বের চোখ থাকবে নিউ জার্সির দিকে।
বাংলাদেশ থেকে খেলা দেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়ের ব্যবধান। আমেরিকা ও কানাডার সঙ্গে আমাদের সময়ের পার্থক্য প্রায় ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা।
বাংলাদেশ সময়ে খেলা কখন শুরু হয়? ম্যাচের সময়সূচি পুরোপুরি ফাইনাল না হলেও, ধারণা করা হচ্ছে খেলাগুলো বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৩টা বা ভোর ৫টার মধ্যে শেষ হবে। মানে, ইউরোপীয় লিগ দেখতে আমরা যেমন রাত জাগি, এবারও অফিস-আড্ডা বাদ দিয়ে একটু বেশিই রাত জাগতে হবে।
কোথায় দেখা যাবে? বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যে সাধারণত টফি (Toffee) অ্যাপ এবং কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেল (যেমন গতবার গাজী টিভি ও টি স্পোর্টস দেখিয়েছিল) স্বত্ব কিনে থাকে।স্বত্ব এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও ধারণা করা যায় অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের জন্য টফি এবং টিভির জন্য একাধিক চ্যানেল সম্প্রচার করবে।
তাহলে হিসাবটা ক্লিয়ার তো? ৪৮ দল, ১২ গ্রুপ, এবং প্রথমবারের মতো রাউন্ড অফ ৩২— ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফরম্যাট সত্যিই এক অন্যরকম রোমাঞ্চ বয়ে আনতে চলেছে। গ্রুপ থ্রি হয়েও সুযোগ পাওয়ার এই সিস্টেমে ছোট দলগুলো যেমন বড় অঘটন ঘটানোর স্বপ্ন দেখবে, তেমনই বড় দলগুলোর জন্যও একটু বাড়তি সতর্কতা জরুরি হয়ে পড়েছে। ১০৪টি ম্যাচের এই মহাযজ্ঞ কমপক্ষে ৪০ দিন ধরে আমাদের ঘুম হারাম করে দেবে।
এবার কমেন্ট সেকশনে জানতে ইচ্ছা করছে— এতগুলো দলের মধ্যে তোমার প্রিয় দল কে? আর তোমার কি মনে হয়, এই ফর্ম্যাটে কোনো ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার অঘটন ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে গেল নাকি কমল? নিচে জানিয়ে দাও আর পোস্টটি শেয়ার করে তোমার বন্ধুদেরও এই নতুন নিয়ম সম্পর্কে জানিয়ে দাও!